বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি
![]() |
| ছবি অনলাইন থেকে সংগৃহীত |
Latest News, Breaking News Today - Videos, Cricket, Business, Politics - Chakma Today | Chakma Today
Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.
Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.
Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.
Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.
Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.
বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি
![]() |
| ছবি অনলাইন থেকে সংগৃহীত |
![]() |
| মিয়ানমারের মংডু থেকে পাঁচ বছর আগে পাঁচ সন্তানসহ বাংলাদেশে আসেন আমির আলী ও আমিনা খাতুন দম্পতি। তারা এখন বান্দরবানের কাইছতলীতে বাড়ি তৈরি করছেন। ছবি: সঞ্জয় কুমার বড়ুয়া/স্টার |
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করার পাঁচ বছরের মধ্যেই একটি রোহিঙ্গা পরিবারের চার ছেলে, এক মেয়ে সবাই ভোটার হয়েছেন এবং পাহাড়ের নির্জন একটি এলাকায় দোতলা বাড়ি করছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে— কত সহজে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করা যায়, স্থায়ী হওয়া যায়?
রোহিঙ্গা আমির আলীর পরিবার। আমির আলী জানান, তিনি তার স্ত্রী আমিনা খাতুন ও তাদের পাঁচ সন্তান প্রায় পাঁচ বছর আগে মিয়ানমারের মংডু থেকে বাংলাদেশে আসেন। তারা এখন বান্দরবানের কাইছতলীতে বসতি স্থাপন করেছেন।
সম্প্রতি ওই এলাকায় গেলে দেখতে পাই, আমিরের পরিবার যে জমিতে বসবাস করছেন, সেখানে তারা একটি দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করছেন।
আমির স্বীকার করলেন প্রায় দশ শতক জায়গার ওপর পরিবার নিয়ে তিনি আছেন এবং সেই জায়গাটি তিনি কারও কাছ থেকে কিনে নেননি।
২০১৭ সালের আগে সীমান্ত অতিক্রম করে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে বসবাস শুরু করেছেন, আমির তাদেরই একজন এবং এটি তিনি অবলীলায় স্বীকার করেছেন।
স্থানীয় মো. সিরাজ বলছিলেন, ‘শুধু আমিরের পরিবার নয়, হলুদিয়া থেকে প্রান্তিক লেক পর্যন্ত এখন প্রায় ২০০ রোহিঙ্গা পরিবার রয়েছে। প্রতিনিয়ত এখানে নতুন নতুন রোহিঙ্গাদের দেখা যাচ্ছে।’
স্থানীয় এবং কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় রোহিঙ্গারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করছেন এবং সেখানকার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারছেন।
‘রোহিঙ্গা পরিবারগুলো বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির অধীনে যেমন: বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফসহ নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সরকারি ভাতা পান’, বলেন সিরাজ।
আমাদের দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়াও পাহাড়ে বসতি স্থাপন করা রোহিঙ্গাদের জন্য কঠিন কিছু না।
বেশ কয়েক বছর আগে মিয়ানমারের বুচিডং এলাকা থেকে আসা নূর নাহার বেগমও এখন বান্দরবানের সুয়ালক ইউনিয়নের হরিণ মারা এলাকায় বসতি স্থাপন করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।
নূর নাহার বলেন, ‘আমরা একজন স্থানীয়কে বছরে চার হাজার টাকার দিয়ে এই এলাকায় বসবাস করি।’
‘হরিণ মারা এলাকায় ২২টি রোহিঙ্গা পরিবার ইতোমধ্যে বসতি স্থাপন করেছেন। তাদের অনেকেই বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্রও সংগ্রহ করেছেন। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত টাকা নেই বলে আমার স্বামী ও আমি এখনো কার্ডটি পাইনি’, বলেন নূর নাহার।
এই এলাকার জাফর আলম নামে একজনের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে যেটি ২০১৭ সালের ২ নভেম্বর বান্দরবান থেকে ইস্যু করা হয়েছিল। জাতীয় পরিচয়পত্রে জাফরের জন্মস্থান কক্সবাজার দেখানো হয়েছে এবং তার জন্ম সাল দেখানো হয়েছে ১৯৬৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি।
জাফরের প্রতিবেশী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘জাফর বেশ কয়েক বছর আগে মিয়ানমার থেকে এসে এই এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।’ জাফর এখন সেটি অস্বীকার করে বলছেন, তার জন্ম বাংলাদেশের কক্সবাজারে। বান্দরবানে এসে তিনি ভোটার হয়েছেন।
নাইক্ষ্যংছড়ির দোছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাবিবুল্লাহ বলেছেন, ‘দোছড়িতে প্রায় ৩০০ রোহিঙ্গা আছেন, যারা কয়েক বছর আগে এখানে এসেছেন।’
নাম প্রকাশ না করার শর্তে দোছড়ি এলাকার কয়েকজন স্থানীয় দাবি করেছেন যে, হাবিবুল্লাহর বাবা-মাও মিয়ানমার থেকে আসা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘আমার বাবা-মা বহু বছর আগে কক্সবাজারের রামু এলাকায় থাকতেন। তবে, আমার জন্ম দোছড়িতে।’
জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় অনেকেই জানায়, প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা পরিবার বান্দরবান জেলায় বসতি স্থাপন করেছেন। এদের বেশিরভাগ নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, আলীকদম, রোয়াংছড়ি ও বান্দরবান সদরে রয়েছেন।
আলীকদম উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিন বলেন, ‘গত সাত-আট বছরে প্রায় ৫০০ রোহিঙ্গা পরিবার উপজেলায় বসতি স্থাপন করেছে এবং এখানে বার্মাইয়া বা বার্মিজ পাড়া নামে একটি গ্রামও রয়েছে।’
সুয়ালক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উ ক্যনু মারমা বলেন, ‘২০০৭-২০০৮ সালের আগে সুয়ালক এলাকায় রোহিঙ্গা ছিল না। কিন্তু, এখন এই এলাকায় প্রায় দুই শর বেশি রোহিঙ্গা পরিবার বাস করে।’
তিনি আরও জানান, এর মধ্যে এই এলাকার প্রায় ৫০টি রোহিঙ্গা পরিবার ভোটার তালিকায় নিবন্ধিতও হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান চ্যাপ্টারের সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় প্রশাসন কেবল রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন করতে সহায়তা করছে না, তারা তাদেরকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে এবং স্থায়ী বসবাসের সনদও দিচ্ছে।’
বান্দরবানের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সনদ দেওয়ার একটি সিন্ডিকেট রয়েছে।’
‘২০১৯ সালে মূলত রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে আমরা প্রায় এক হাজার ৯০০টি আবেদন বাতিল করে দিয়েছি। কারণ আবেদনের সঙ্গে যেসব ডকুমেন্ট দেওয়া হয়েছিল, তাতেই আমাদের সন্দেহ হয়েছিল যে এই আবেদনকারীরা বাংলাদেশি নন’, যোগ করেন মোহাম্মাদ রেজাউল করিম।
তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাদের জন্ম সনদ দেন।’
এ বিষয়ে বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুব আলম বলেন, ‘সম্প্রতি বান্দরবানে রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপনের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। যারা বিভিন্ন সরকারি ভাতা পাচ্ছেন, তারা হয়তো এই অঞ্চলটিতে অনেক আগে এসেছিলেন।’
পার্বত্য চট্টগ্রামে রোহিঙ্গাদের ক্রমবর্ধমান বসতি স্থাপন সেখানকার পাহাড়িদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যকে আরও বেশি হুমকির মধ্যে ফেলবে বলে পাহাড়িরা মনে করছেন।
১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সংকট চলছে, তার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাধ বসতি স্থাপন, পাহাড়ে বসবাসের স্থায়ী ঠিকানা দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সনদ প্রদানসহ নানামুখী কার্যক্রমে রোহিঙ্গাদের নাম সুকৌশলে নিবন্ধন এই অঞ্চলের পাহাড়িদের জন্য এক অশনিসংকেত বলে মনে করা হচ্ছে।
বান্দরবানে বিশেষ করে লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা বিভিন্ন সময় পাহাড়িদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগ রয়েছে। আরও অনেক জুমিয়া পরিবার উচ্ছেদ আতঙ্কে আছেন বলে জানা গেছে।
২০১৬ সালে লামা উপজেলার ছোট কলার ঝিরি এলাকায় শহিদুল ইসলাম নামে একজন প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে ওই এলাকার ৮২টি ম্রো পরিবারের জুমের জায়গা দখলের অভিযোগ উঠেছিল। ওই এলাকায় রশিদ আহমেদ নামে একজন রোহিঙ্গা যিনি অর্থের বিনিময়ে ম্রোদের জায়গা দখল করতে গিয়েছিলেন তার সঙ্গে কথা হয়।
রশিদ জানান, শহিদুল প্রায় ২০-২৫ জন রোহিঙ্গাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল এবং তাদের সেখানে থাকার ব্যবস্থা করেছিল। যেন ম্রোরা ভয়ে জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হন। বিষয়টি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।
বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে আদিবাসী সংগঠনগুলো। ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা কামাল লোহানী আমৃত্যু বাংলাদেশের আদিবাসীদের সংকটে সাথী ছিলেন এবং আদিবাসী অধিকার নিয়ে স্বোচ্ছার ভূমিকা রেখেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন এবং পাহাড়ের আদিবাসীদের সংকটে নানা সময় পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি জানিয়েছিলেন।
এদিকে তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারন সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। আদিবাসী ফোরামের নেতারা ভার্চুয়াল মাধ্যমে শোক প্রকাশ করে বলছেন, ‘বাংলাদেশের আদিবাসীরা তাঁদের এক অকৃত্রিম বন্ধুকে হারাল।’
এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে শোক জানিয়ে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন তথা পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে কামাল লোহানী আদিবাসী মানুষের কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। জুম জনপদের নানা সংকট ও হাহাকারে আওয়াজ তোলা এ মানুষটির প্রয়ানে বিনম্র শ্রদ্ধাও জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ।
বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগসহ করোনায় আক্রান্ত হয়ে আজ সকালে মারা যান বহু গুনের অধিকারী এ মানুষটি। প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অগ্রপথিক এ মানুষটির প্রয়ানে আরো শোক জানিয়েছে হিল উইমেন্স ফেডারেশন, আদিবাসীদের মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।

হিল ভয়েস: সাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী আদিবাসী জুম্মদেরকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণের কার্যক্রম জোরদার হয়েছে। বিশেষ করে আর্থিক সুযোগ–সুবিধা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, গৃহ নির্মাণ, গরু–ছাগল পালন, সুদ–মুক্ত ঋণ ইত্যাদি প্রলোভন দেখিয়ে বান্দরবান জেলায় ধর্মান্তরকরণ চলছে। বান্দরবান জেলায় ‘উপজাতীয় মুসলিম আর্দশ সংঘ’, ‘উপজাতীয় মুসলিম কল্যাণ সংস্থা’ ও ‘উপজাতীয় আর্দশ সংঘ বাংলাদেশ’ ইত্যাদি সংগঠনের নাম দিয়ে জনবসতিও গড়ে তোলা হয়েছে এবং এসব সংগঠনের মাধ্যমে জুম্মদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণের কাজ চালানো হচ্ছে।
এমনকি লেখাপড়া শেখানোর লোভ দেখিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে তাদের মাতা–পিতা থেকে নিয়ে ঢাকা, গাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পিতা–মাতার অজান্তে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার সংবাদ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। অন্যদিকে জুম্ম নারীদেরকে ফুসলিয়ে কিংবা ভালবাসার প্রলোভন দেখিয়ে বিয়ে করা এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। কোন কোন ক্ষেত্রে বিয়ের কিছুদিন পর বিবাহিত জুম্ম নারীকে শারীরিক নির্যাতন করা এবং নানা অজুহাতে তাড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এমনকি বিবাহিত জুম্ম নারীর সাথে যৌন জীবনের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতেও দেখা গেছে।
বলাবাহুল্য, স্মরণাতীত কাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি অমুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল। চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, তঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বম, খিয়াং, লুসাই, পাংখো, খুমী, চাক প্রভূতি আদিবাসী জাতি স্মরণাতীত কাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে আসছে, যারা বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী এবং সম্মিলিতভাবে নিজেদেরকে ‘জুম্ম’ (পাহাড়ি) নামে পরিচয় দেয়।
১৯৪৭ সালে ভারত–পাকিস্তান বিভক্তির সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী এসব আদিবাসী জাতিসমূহের জনসংখ্যা ছিল ৯৭.৫%। আর ছিল মুসলিম বাঙালি জনসংখ্যা ১.৫% ও হিন্দু বাঙালি জনসংখ্যা ১.০%। ভারত বিভক্তি আইনকে সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ব্রিটিশরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের সাথে যুক্ত করে দেয়। এতে জুম্ম জনগণ প্রতিবাদ করে এবং ভারতে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানায়। কিন্তু তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তথা ভারতীয় নেতৃবৃন্দের উদাসীনতার কারণে জুম্ম জনগণের দাবি অগ্রাহ্য থেকে যায়।

অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির পর পরই তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার কার্যক্রম হাতে নেয়। তার মধ্যে অন্যতম হলো জুম্ম জনগণের রক্ষাকবচ হিসেবে বিদ্যমান ব্রিটিশ প্রবর্তিত আইন, বিধি ও বিধিব্যবস্থা বাতিল করা; আইন লঙ্ঘন করে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বসতি প্রদান করা; উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ ও বাস্তবায়নের (ডেভেলাপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের) মাধ্যমে জুম্ম জনগণের অর্থনৈতিক মেরুদ– ভেঙ্গে দেয়া এবং তাদের চিরায়ত ভূমি ও বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করা; সর্বোপরি বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী আদিবাসী লোকগুলোকে ধীরে ধীরে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের সরকারসমূহও অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার পাকিস্তানী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ অব্যাহত রাখে। যার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সরকারি অর্থায়নে সমতল অঞ্চলের চার লক্ষাধিক মুসলমান পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি প্রদান করা। সেই সাথে চলতে থাকে নানা প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে কিংবা হুমকি–ধামকি দিয়ে জুম্মদেরকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণের কার্যক্রম। ফলে যেখানে ১৯৪৭ সালে জুম্ম ও মুসলিমদের অনুপাত ছিল ৯৮ জন জুম্ম ২ জন মুসলিম, আজ ৭৩ বছর পর এই অনুপাত উল্টো হতে শুরু হয়েছে। বর্তমানে ৫৫ জন মুসলিম ৪৫ জন জুম্ম। আর আগামী ২০৪৭ সালের ঠিক উল্টো চিত্র অর্থাৎ ৯৮ জন মুসলিম ২ জন জুম্ম, এমনই অনুপাত দাঁড়াবে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামক অঞ্চলে জনসংখ্যার।
১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর ইসলাম ধর্মে দীক্ষিতকরণের কাজ কিছুটা ভাটা পড়েছিল। কিন্তু দীর্ঘ ২৩ বছরেও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায়, বিশেষ করে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরকারী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের একনাগাড়ে দীর্ঘ ১২ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রশাসনের ছত্রছায়ায় মৌলবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক জুম্মদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণের কাজ বর্তমানে চাঙ্গা হয়েছে। নিম্নে এর কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো–
শিক্ষার সুযোগ দানের ফাঁদ পেতে মাদ্রাসায় ভর্তি ও ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণ
দেশের কিছু প্রত্যন্ত আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার শিশুদের জোরপূর্বকভাবে তাদের স্ব স্ব ধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। এসমস্ত পরিবারসমূহ আর্থিক অস্বচ্ছলতা ও তাদের এলাকা থেকে স্কুলের দুর্গম্যতার কারণে তাদের শিশুদের স্কুলে পাঠাতে না পারায়, দরিদ্র ও নিরক্ষর আদিবাসী পরিবারের শিশুরা এরূপ ধর্মান্তরকরণের প্রধান শিকার। এই অমুসলিম আদিবাসী সম্প্রদায়কে ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্যে ধর্মীয় মৌলবাদীরা সারা দেশকে ‘ইসলামীকরণ’-এর উদ্দেশ্য নিয়ে গোপনে কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীকে প্রলুব্ধ করার জন্য শিক্ষাকে ব্যবহার করছে।

দরিদ্র অনেক আদিবাসী মানুষের সাধ আছে, কিন্তু সাধ্য নেই নিজেদের শিশুদের লেখাপড়া করানোর। আর সেটাকেই ধর্মান্তরিতকরণের মোক্ষম সুযোগ ও সম্ভাবনা হিসেবে বেছে নেয় ইসলামী মৌলবাদী চক্র। দরিদ্র ও নিরক্ষর আদিবাসী পরিবারের শিশুরা এরূপ ধর্মান্তরকরণের প্রধান শিকার।
যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠী প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাস করে থাকে, সেহেতু জুম্ম শিশুদের ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ থাকে না, যদিও সেখানে আদৌ স্কুল থাকে। স্কুলে যেতে ও স্কুল থেকে ফিরে আসতে আদিবাসী শিশুদের পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতে হয় কয়েক মাইল। এছাড়া জুম্ম জনগোষ্ঠী জাতীয় সমাজের অন্যতম সবচেয়ে দরিদ্রতম অংশ হওয়ায়, আর্থিক দুরবস্থার কারণে অনেক আদিবাসী পরিবারের তাদের শিশুদের ভালো স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্য থাকে না। ফলে তাদের শিশুদের জন্য ভালো শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে এমন যে কোন সুযোগ যখন তারা খোঁজে।
জানা গেছে, ইসলামী ধর্মীয় মৌলবাদীরা তারা ভালো স্কুলে শিক্ষার ব্যবস্থা করবে এই প্রলোভন দেখিয়ে এবং বিভিন্ন সুযোগ–সুবিধার কথাবলে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল আদিবাসী পরিবারগুলোকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু বাস্তবে এইসব ধর্মীয় মৌলবাদীরা আদিবাসী শিশুদের কখনোই ভালো স্কুলে নিয়ে যায় না, বরং ইসলামে ধর্মান্তরিত করার অভিসন্ধি নিয়ে তাদেরকে ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসায় নিয়ে যায়। সেখানে সেই শিশুদের ধীরে ধীরে নিজের পরিবার, সমাজ ও সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে ইসলামী ধর্ম ও সংস্কৃতি শিখতে ওগ্রহণ করতে বাধ্য করে।
গত ১ জানুয়ারি ২০১৭, ঢাকায় এক মাদ্রাসায় পাচার হওয়ার সময়, পুলিশ বান্দরবান শহরের ‘অতিথি আবাসিক হোটেল’ থেকে চার আদিবাসী শিশুকে উদ্ধার করে। ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তিরিত আবু বক্কর সিদ্দিক (৪৫), যার পূর্ব নাম মংশৈ প্রু চৌধুরী ও মোহাম্মদ হাসান (২৫) এই পাচারকাজের অন্যতম মূল হোতা বলে জানা যায়। তাদেরকে উক্ত চারজন শিশুসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয়। অপরদিকে তাদের সঙ্গী সুমন খেয়াং গ্রেফতার থেকে পালিয়ে যায়। গ্রেফতারের পর বান্দরবান সদর থানায় একটি মানবপাচার মামলা দায়ের করা হয়। উদ্ধারকৃত শিশুরা সকলেই বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের বাসিন্দা। অপরাধ চক্রের সদস্যদের কর্তৃক শিশুদের পরিবারগুলোকে ঢাকায় বিনা খরচে তাদের শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করার প্রলোভন দেখানো হয়।
উদ্ধারকৃত শিশুরা, যারা সকলেই বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়ন থেকে, তারা হল– হেডম্যান পাড়ার উহ্লা অং মারমার মেয়ে মাসিং সই মারমা (১২) ও পাচিনু মারমার ছেলে থোয়াইলা মারমা (৮); বেতছড়ামুখ পাড়ার সাউপ্রু মারমার মেয়ে নুছিং উ মারমা (১২) এবং বৈদ্য পাড়ার অং থোয়াই চিং মারমার মেয়ে মেচিং প্রু মারমা (১৩)। পাচারকারী চক্রের সদস্যদের কর্তৃক শিশুদের পরিবারগুলোকে ঢাকায় বিনা খরচে তাদের শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করার প্রলোভন দেখানো হয়।
সুবিধাবঞ্চিত ও অশিক্ষিত পরিবেশ থেকে আসা অনেক প্রত্যন্ত আদিবাসী পরিবার তাদের শিশুদের অধিকতর ভালো ভবিষ্যতের মিথ্যা আশার ফাঁদে পড়েন। তবে এটা সবসময় বিনামূল্যে হয় না, পরিবারগুলোতে কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে কিছু টাকা খরচ করতে হয়। যেহেতু ধর্মান্তরিতকরণ সম্পর্কিত কোন বিষয়ে ইঙ্গিত দেয়া হয় না, তাই মা–বাবারা সহজেই তাদের শিশুদের জন্য ভালো ভবিষ্যতের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়।
কাপেং ফাউন্ডেশন ২০১৭ সালের তার বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনের পূর্ববর্তী সংখ্যায় আদিবাসী শিশুদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিতকরণের এরকম কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরে। তার পূর্ববর্তী ৭ বছরে অন্তত ৭০ জন আদিবাসী শিশু, অধিকাংশই খ্রিস্ট্রীয় ও হিন্দু ধর্মের সাথে যুক্ত, তাদেরকে দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে পুলিশ কর্তৃক উদ্ধার করা হয়। এসব শিশুদের অধিকাংশই বান্দরবান জেলা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল।
এর পূর্বে ২ জানুয়ারি ২০১৩, পুলিশ ঢাকার সবুজবাগ থানাধীন আবুযোর জিফারি মসজিদ কমপ্লেক্স নামের এক মাদ্রাসা থেকে ১৬ আদিবাসী শিশুকে উদ্ধার করে। শিশুদের জোর করে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়। ত্রিপুরা ও চাকমা জাতিভুক্ত এসব শিশুদের পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতারণা করে নিয়ে যাওয়া হয়। এছাড়া ৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আদিবাসী ত্রিপুরা শিশুদের আরেকটি গ্রুপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দ ও ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের নেতৃবৃন্দ কর্তৃক ঢাকা থেকে উদ্ধার করা হয়। শিশুদেরকে বান্দরবানের চিম্বুক এলাকা থেকে ফিরোজপুর জেলার একটি মাদ্রাসায় নেয়া হচ্ছিল। তাদেরকে একটি মিশনারী স্কুলে ভর্তি করানো হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল।
এর আগে ২০১২ সালের জুলাই মাসেও গাজীপুর ও ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে ১১ জন আদিবাসী ত্রিপুরা শিশুকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে গাজীপুর জেলার মিয়া পাড়ার দারুল হুদা ইসলামী মাদ্রাসা থেকে ৮ শিশুকে এবং ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক মাদ্রাসা থেকে ১ নারী শিশু ও গুলশানের দারুল হুদা মাদ্রাসা থেকে ২ শিশুকে উদ্ধার করা হয়।
২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে পুলিশ কর্তৃক কেবল বান্দরবান শহরের এক মোটেল ‘অতিথি বোর্ডিং’ থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ৩৩ শিশুকে উদ্ধার করে। বান্দরবানের থানচি উপজেলা থেকে এই শিশুদের সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ধানমন্ডী আদর্শ মদিনা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হবে এই প্রতিশ্রুতি ও প্রলোভন দেখিয়ে। এসময় পুলিশ গর্ডন ত্রিপুরা ওরফে রুবেল, ঢাকার দারুল ইহসান মাদ্রাসার ছাত্র আবু হোরাইরা ও শ্যামলীর বাসিন্দা আবদুল গণি নামের শিশুদের পাচারকারী তিন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে।
অন্যদিকে লাদেন গ্রুপ নামে খ্যাত মুহাম্মদিয়া জামিয়া শরিফা লামা উপজেলায় দখল করেছে ৭ হাজার একর পাহাড় ভূমি। লাদেন গ্রুপের কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম হলো আদিবাসীদের বসতভিটা ও জুমভূমি জবরদখল করা, বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ দিয়ে আদিবাসী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ও খ্রিস্টানদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা এবং ঢাকায় উন্নত ও উচ্চ শিক্ষার প্রলোভন দিয়ে আদিবাসী শিশু–কিশোরদের কৌশলে ঢাকায় নেয়া। এই গ্রুপ ফাসিয়াখালীর মৌজার হেডম্যান মংথুই প্রু মারমার ২৫ একর জমিসহ ফাসিয়াখালী ও সাঙ্গু মৌজার আদিবাসী ম্রো, ত্রিপুরা ও মারমাদের শত শত একর জমি অবাধে দখল করে নিয়েছে। লাদেন গ্রুপের বিরুদ্ধে জায়গা–জমি জবরদখল করে অবৈধভাবে বাণিজ্যিক বাগান করা এবং এসব অঞ্চলে জঙ্গি তৎপরতা চালানোর অভিযোগ রয়েছে।
অপরদিকে বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় ‘কোয়ান্টাম ফাউন্টেশন’ নামে জাতীয় পর্যায়ের একটি এনজিও কর্তৃক ২০০১ সাল প্রতিষ্ঠিত কোয়ান্টাম স্কুল ও কলেজে নানা প্রলোভন দেখিয়ে জুম্ম ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করা হয়। কোয়ান্টাম আবাসিক স্কুলে জুম্ম ছাত্রছাত্রীদের মাতৃভাষায় কথা বলতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়ে থাকে। ফলে মাতৃভাষায় কথা বলার সুযোগের অভাবের কারণে জুম্ম শিশুরা মাতৃভাষা ভুলে যেতে থাকে। বিশেষ করে কোয়ান্টামে ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুরক্ত ও সেই ধর্মীয় সংস্কৃতিতে জুম্ম ছাত্রছাত্রীদের গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে। উক্ত কলেজে জুম্ম ছাত্রছাত্রীদেরকে সরাসরি ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণে উদ্বুদ্ধ না হলেও ইসলামী আদব–কায়দা ও জীবনাচারে গড়ে তোলা হয়। তাদেরকে শ্রেণিকক্ষে ‘সালামালিকুম’, ‘ওলাইকুম সালাম’ ইত্যাদি ইসলামী সম্বোধন ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয়। নামাজ কিভাবে আদায় করতে হয় তা শেখানো হয়।

কোয়ান্টাম সংস্থা শুরু থেকে জুম্মদের মনজয় করার উদ্দেশ্যে প্রত্যেক কোরবান ঈদের সময় শত শত গরু জবাই করে আশপাশের এলাকার সকল জুম্মদেরকে ডেকে ডেকে তালিকা করে গরুর মাংস ভাগবন্টন করে দিতো। এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল আপন সেজে সহজ সরল জুম্মদের, বিশেষ করে ম্রোদের জায়গা জমি দখল করে নেয়া ও তাদেরকে ইসলামী খাদ্য–সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করা। ৬–৭ মে ২০১৭ তারিখে ঢাকা থেকে এক নাগরিক প্রতিনিধিদল কোয়ান্টাম কর্তৃক লামায় ম্রো গ্রামবাসীর প্রায় ২,০০০ একর ভূমি বেদখল করা এবং জুম্ম ছাত্রছাত্রীদের মাতৃভাষায় কথা বলার সুযোগের অভাবের কারণে তাদের মাতৃভাষা ভুলে যাওয়ার অভিযোগ তদন্ত করতে গেলে সেনাবাহিনী বাধা প্রদান করে। ফলে তদন্ত না করে নাগরিক প্রতিনিধিদলকে ঢাকায় ফিরতে হয়।
বাংলাদেশের সংবিধান দেশের শিশুদেরকে জোরপূর্বক ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানে নিষেধ করে। সংবিধানের ৪১(২) ধারায় উল্লেখ রয়েছে যে, ‘কোন শিক্ষা–প্রতিষ্ঠানে যোগদানকারী কোন ব্যক্তির নিজস্ব ধর্ম–সংক্রান্ত না হইলে তাঁহাকে কোন ধর্মীয় শিক্ষ গ্রহণ কিংবা কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উপাসনায় অংশগ্রহণ বা যোগদান করিতে হইবে না।’ তবু আদিবাসী শিশু ও তাদের পরিবার শিক্ষার ফাঁদে পড়ায়, আদিবাসী শিশুদের জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণ অব্যাহতভাবে চলছে। রাষ্ট্র একদিকে আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হচ্ছে, অপরদিকে ইহা সংবিধানকে লংঘন করছে।
তবু এ পর্যন্ত সরকারি সংস্থা ও বেসরকারি সংগঠনসমূহের তরফ থেকে আদিবাসী শিশুদের তাদের নিজেদের ধর্ম থেকে অপর একটি ধর্মে দীক্ষিতকরণ থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে কোন উদ্যোগ দেখতে পাওয়া যায় না। সরকারি ও বেসরকারি উভয় সংস্থা থেকে কতজন শিশু ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়ে সে ব্যাপারে যথাযথ কোন তথ্য–উপাত্ত পাওয়া যায় না। যদি অবিলম্বে এ ধরনের ধর্মান্তরকরণ প্রতিরোধে কোন পদক্ষেপ নেয়া না হয়, তাহলে অনেক আদিবাসী শিশু তাদের বিশ্বাস, সংস্কৃতি, ভাষা, ও জীবিকা হারিয়ে ফেলবে।
উপজাতীয় মুসলিম আর্দশ সংঘ ও তাবলীগ জামায়াত কর্তৃক আলিকদম ও লামায় ধর্মান্তরকরণ
বান্দরবান জেলার আলিকদম উপজেলা থানচি সড়ক ১১ কিমি এলাকায় ১ জানুয়ারি ২০১৮ সালে ১৪টি অসহায় ও গরিব পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার নাম করে তাদের মাঝে সুদ মুক্ত ঋণ, তাদের মাঝে গৃহপালিত গরু–ছাগল দেওয়া হবে, তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দেওয়া সহ নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র পাহাড়িদের মন ভুলিয়ে সুযোগ বুঝে গোপনে উপজাতীয় মুসলিম আর্দশ সংঘ ও দাওয়াতে তাবলীগের মাধ্যমে তাদেরকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করছে।
গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, ঈদগাঁও মডেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াবেটিস কেয়ার সেন্টারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডা: মো: ইউসুফ আলী মানবকল্যাণ কাজ তথা অসহায়, গরীব, দু:স্থ রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবাসহ নানান মানব সেবামূলক কাজকর্মের মাধ্যমে স্থানীয় গরিব পাহাড়িদের সম্পর্ক গড়ে তোলে। তেমনি তার হাসপাতালে চিকিৎসা করতে আসা উপজাতীয় মুসলিমদের সাথে পরিচয় ঘটে। তাদের সমস্যার কথা জেনে এ পরিবারগুলোর সন্তানদের লেখাপড়ার সুব্যবস্থা করে। বর্তমানে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ১৯ জনের মত জুম্ম ছেলেমেয়ে মুসলিম রয়েছে। অনেকে ঈদগাঁও’র বিভিন্ন মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া শেষ করছে।
কয়েকজন উপজাতীয় মুসলিমদের সাথে কথা বলে জানা যায় যে, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাদেরকে বিভিন্নভাবে আর্থিক সহযোগিতা ও সুযোগ সুবিধা দেওয়া হবে; গরু–ছাগল, নগদ অর্থ, গৃহ নির্মাণ করে দেওয়াসহ সুদ ঋণ দেওয়া হবে ইত্যাদি প্রলোভন দেখানো হয়। খ্রীস্টান ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া আবু বক্কর ছিদ্দিক (যার পূর্বের নাম অতিরম ত্রিপুরা) বলেন, কোর্ট গিয়ে এফিডেভিট মূলে ধর্ম ও নাম পরির্বতন করে মুসলিম হতে হয়। তিনি আরো বলেন, বর্তমানে তার ছেলে সাইফুল ইসলাম (পূর্বের নাম রাফেল ত্রিপুরা) ডা: ইউসূফ আলী হাসপাতালে চাকরিরত আছে।

তিনি বলেন, বাইবেলে লেখা আছে যে তোমরা সত্যকে খোঁজ, সত্য তোমাদের মুক্ত করবে। সে সত্যকে খুঁজতে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন বলে তিনি জানান। তার মা, বাবা, ভাইসহ সবাই মুসলিম হয়েছে। অন্যদিকে আলিকদমের জেসমিন আক্তার (পূর্বের নাম ঝর্ণা ত্রিপুরা), রোয়াংছড়ির সাদেকুল ইসলাম (জয়খর্ন ত্রিপুরা), গয়ালমারার নুরুল ইসলাম (প্রশান্ত ত্রিপুরা) সবাই এফিডেভিট মুলে ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে জানান। তবে তারা আরো উল্লেখ্য করেন যে, ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর ডা: ইউছুপ আলীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি তাদেরকে মানবিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন।
এদিকে লামা উপজেলার গয়ালমারা গ্রামে বসাবসরত ত্রিপুরাদের উপজাতীয় মুসলিম কল্যাণ সংস্থা ও উপজাতীয় আর্দশ সংঘ বাংলাদেশ, তাবলিগ ও জামায়াত–এর আলেম হাফেজ মো: জহিরুল ইসলাম, হাফেজ মো: কামাল, মো: মোহাম্মদুল্লাহ, হাফেজ মো: সালামাতুল্লাহ, মৌলভী হেলাল উদ্দিন ত্রিপুরা এবং সাইফুল ইসলাম ত্রিপুরা সভাপতি উপজাতীয় নুও মুসলিম আর্দশ সংঘ তাদের নেতৃত্বে গয়ালমারা ৪৫টি পরিবারকে আর্থিক ও নানা ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে।
অন্যদিকে আলিকদমের জেসমিন আক্তার পূর্বের নাম ঝর্ণা ত্রিপুরা, রোয়াংছড়ির সাদেকুল ইসলাম পূর্বের নাম জয়খর্ন ত্রিপুরা, গয়ালমারায় নুরুল ইসলাম পূর্বের নাম প্রশান্ত ত্রিপুরা সবাই ইসলামী ধর্মান্তরকরণের শিকার হয়েছেন। আলিকদম–থানচি ১১ কিলো এলাকাসহ মোট ৪৫ পরিবার ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন।
সরেজমিন তদন্তে জানা যায় যে, বান্দরবান পৌর এলাকার বাস ষ্টেশনে ১৯৯৯ সালের দিকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত ত্রিপুরা ও খিয়াং রয়েছে ৩০–এর অধিক পরিবার এবং টাংকি পাড়ায় ২০০১ সাল থেকে বসবাস রয়েছে নুও ত্রিপুরা মুসলিমদের ১৫–এর অধিক পরিবার।
লামা উপজেলার লাইনঝিড়িতে ১৯৯৫ সাল থেকে ত্রিপুরা মুসলিমদের ১৭–এর অধিক পরিবার ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে। গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মোঃ রাসেল ত্রিপুরা (পূর্বের নাম রামন্দ্র ত্রিপুরা)-এর স্ত্রী সারেবান তাহুরা ত্রিপুরা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল। আলিকদম–থানচি সড়কের ক্রাউডং (ডিম পাহাড়) এলাকায় (রূপসী ইউনিয়ন) ২০০০ সাল থেকে ত্রিপুরা মুসলিমদের রয়েছে ১৬ পরিবারের মতো।
দীঘিনালা রিজিয়ন কমান্ডার কর্তৃক ধর্মান্তরকরণ
১৯৯২ সালে দীঘিনালা রিজিয়ন কমান্ডার কর্ণেল মাহবুব হাসান আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে জোর করে আটজন চাকমাকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন। ধর্মান্তরিতরা ব্যক্তিরা হলেন– ১. বলিরঞ্জন চাকমা, নামকরণ মোঃ সাজেদ আলী শেখ; ২.স্বর্ণা চাকমা, নামকরণফাতেমা খাতুন; ৩. রসিক গুরি চাকমা, নামকরণ মোসাম্মত রওশন আরা বেগম; ৪. মিলাবো চাকমা, নামকরণ মোসাম্মত তসলিলা খাতুন; ৫. দিঘী কুমার চাকমা, নামকরণ মোঃ আবদুল্লাহ; ৬. সুখী চাকমা, নামকরণ মোসাঃ সখিনা খাতুন এবং ৭. শংকর চাকমা, নামকরণ আবদুল শহীদ মোঃ সাইফুল ইসলাম। তাদের ইসলামে ধর্মে দীক্ষা দেন মৌলবী হাফেজ মোহাম্মদ আবুল বাশার। তাদের শপথনামা পাঠ করান দীঘিনালা থানার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদ রানা। যাদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয় তারা সকলে দীঘিনালার বানছড়া গ্রামের বাসিন্দা। (সূত্রঃ স্নেহ কুমার চাকমা, জীবনালেখ্য, পৃষ্ঠা# ২০৮)।

পার্বত্য চট্টগ্রামে মৌলবাদী ও জুম্ম বিদ্বেষী কিছু ইসলামী গোষ্ঠী কর্তৃক সুপরিকল্পিতভাবে আদিবাসীদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হচ্ছে। এধরনের পরিকল্পনা বা কার্যক্রম অনেক আগে থেকে শুরু হলেও সাম্প্রতিককালে এর তৎপরতা অনেক জোরদার হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ধর্মান্তরিতকরণের এই প্রক্রিয়া স্থানীয়ভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় যেমন চলছে, তেমনি ভালো শিক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে আদিবাসী জুম্ম শিশুদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে নিয়ে গিয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হচ্ছে।
২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ত্রিবিউন, ইউএনপিও, বুড্ডিস্টডোর.নেট, হেরাল্ডমালয়েশিয়া.কমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ও প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি ২০১০ হতে জানুয়ারি ২০১৭ সালের মধ্যে সাত বছরে কেবল পুলিশ কর্তৃক ধর্মান্তরে জড়িত ইসলামী চক্রের হাত থেকে ৭২ জন আদিবাসী জুম্ম শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর বাইরে যে আরও অনেক আদিবাসী পরিবার ও শিশু এধরনের অপরাধী চক্রের শিকার হয়েছেন তা সহজেই অনুমেয়। সাম্প্রতিককালে এই ধর্মান্তরিতকরণের তৎপরতা আরও ব্যাপকতা লাভ করেছে বলে জানা গেছে।
সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে, ইউটিউবে প্রচারিত বিভিন্ন ভিডিও, পোস্ট এবং দেশি-বিদেশী বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, তথ্য-উপাত্ত থেকে তা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিগত কয়েক বছরের মধ্যে, বিশেষত কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পরপরই বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলিকদম উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসীদের এ ধরনের ধর্মান্তরিতকরণের ব্যাপক কার্যক্রমের খবর পাওয়া গেছে। যেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্মতি ও সহযোগিতা রয়েছে বলে স্বীকার করা হয়েছে।
আপাত দৃষ্টিতে এই ধর্মান্তরিতকরণ প্রক্রিয়াকে বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ মনে হলেও নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করলে এটি একটি পরিকল্পিত ও সুসমন্বিত কার্যক্রমের অংশ বলে প্রতীয়মান। এই কার্যক্রমে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর যে প্রত্যক্ষ হাত রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে এই প্রক্রিয়াকে নিবিড়ভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে তাও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অপরদিকে ক্ষমতাসীন সরকারি দলের জুম্ম সম্প্রদায়ের স্থানীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই এসব নির্বিঘ্নে ঘটে চলেছে। অবশ্য আদিবাসীদের ধর্মান্তরকরণ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে সহযোগিতা ও মদদদানের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সম্পৃক্ততা এর পূর্বেও বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে।
৪ জুন ২০২০ নিপন ত্রিপুরা তার এক ফেসুবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘সম্প্রীতির বান্দরবানে আর্থিক অস্বচ্ছলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রান্তিক অঞ্চলে বসবাসরত ত্রিপুরাদের অবাধে ধর্মান্তরিত করার ইতিহাস অনেক বছরের পুরনো। সাম্প্রতিক সময়ে তা বহুগুণ বেড়ে গেছে।’
একই দিন ‘লংদুকসা মউগ্রো এম’ তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে এ প্রসঙ্গে লেখেন, ‘সহজ-সরল সাধারণ জুম্ম আদিবাসীদের ভুলিয়ে ভালিয়ে ইসলামিকরণ করা হচ্ছে। কিভাবে মোনাজাত করা হয় শেখানো হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামিকরণ প্রক্রিয়ার অংশ এটি। এখানে খোদ সরকার সংশ্লিষ্ট রয়েছে বলে জানা গেছে। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ইসলামিকরণ ও বাঙালিকরণ প্রকল্পের ধুম পড়েছে বান্দরবানের আলীকদমে।’

প্রান্তিকতা, দারিদ্র্য ও নিরক্ষরতাই ধর্মান্তরিতকরণের সুযোগ
পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের দীর্ঘদিনের অন্যতম সুবিধাবঞ্চিত, অর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ ও অবহেলিত এবং রাজনৈতিকভাবে অশান্ত ও অবদমিত এক এলাকা। ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তান আমলে যেমনি এই অঞ্চল চরম অবহেলা, শোষণ, বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও এই অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও আন্দোলনকে দমন-পীড়নের কারণে জনগণের সামগ্রিক জীবনধারাকে বরাবরই একটা ভঙ্গুর পরিস্থিতি অতিক্রম করতে হয়েছে।
১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধান, সংঘাত নিরসন ও জুম্মসহ স্থায়ী অধিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলেও বিগত ২৩ বছরেও সেই চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবে, এমনকি চুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে পার্বত্য সমস্যার সমাধান, এলাকায় শান্তি ও জনগণের সুষম উন্নয়ন এবং জুম্মদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারার উন্নয়ন এখনও সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।
বিশেষত চুক্তি স্বাক্ষরকারী দল আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন সরকার টানা একযুগের অধিক ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও, সর্বোপরি চুক্তি লংঘন ও চুক্তির সাথে বিরোধাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনজীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা, অস্থিতিশীলতা, হতাশা ও ক্ষোভ। এই অবস্থায় সরকার ও প্রশাসনের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক বৃদ্ধি পেয়েছে জুম্মদের ভূমি বেদখল, স্বভূমি থেকে উচ্ছেদ, তাদের উপর নিপীড়ন, বঞ্চনা ইত্যাদি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের আরও অনেক আদিবাসী জুম্মর জীবনধারা অধিকতর প্রান্তিক অবস্থার দিকে যেতে বাধ্য হয়েছে।
একদিকে আদিবাসীদের এই প্রান্তিক অবস্থা, সামাজিক বিচ্ছিন্নতা, আর্থিক দূরবস্থা, তাদের নিরক্ষরতা ও অজ্ঞতা, অপরদিকে সরকার, প্রশাসন ও স্থানীয় স্বার্থবাদীদের আনুকূল্য ও পৃষ্টপোষকতাÑএই দুই বাস্তবতার সুযোগকে কাজে লাগিয়েই ইসলামী মৌলবাদী চক্র তাদের ধর্মান্তরিতকরণের নীলনকশা বাস্তবায়নে ও জোরদারকরণে উৎসাহিত হয়েছে।
বান্দরবান কি ধর্মান্তরকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে?
পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলাই ইসলামী মৌলবাদী ধর্মান্তরকারী গোষ্ঠীর টার্গেট ও কর্মক্ষেত্র হলেও, সাম্প্রতিককালে বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ইসলামী গোষ্ঠী কর্তৃক দরিদ্র আদিবাসী জুম্মদের ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণ তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মনে হয়, বান্দরবান যেন এখন ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। একটি সূত্রের মতে, বান্দরবান পৌরসভা, আলিকদম, রোয়াংছড়ি, লামাসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০টির অধিক জুম্ম মুসলিম পাড়া বা বসতি রয়েছে। এইসব ধর্মান্তরিত জুম্ম মুসলিমদের বলা হচ্ছে ‘নও মুসলিম’ বা ‘উপজাতি মুসলিম’। এই ধর্মান্তরিত মুসলিম বসতিগুলোকে ঘাটি হিসেবে ব্যবহার করে এবং কিছু বাছাইকৃত নও মুসলিমকে সুবিধা দিয়ে তাদের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ধর্মান্তরের কার্যক্রম সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে।
বান্দরবানের আলিকদম উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা একে এম আইয়ুব খান, ডাঃ ইউসুফ আলী, হাফেজ মাওলানা সালামাতুল্লাহ, আলিকদম সদরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ফরিদ আহম্মদ, আলিকদম উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবুলকালাম, মোঃ জাহিদ, সাহাব উদ্দিন, মাওলানা ইমরান হাবিবি, মোহাম্মদ আইয়ুব প্রমুখ এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ ও বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া গেছে।
অপরদিকে আদিবাসী থেকে ধর্মান্তরিত যেসব নও মুসলিম এসব ধর্মান্তরকরণের সাথে জড়িত তাদের মধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে, তারা হল- জনৈক চাকমা ধর্মান্তরিত মুসলিম মোঃ শহিদ, উপজাতীয় মুসলিম আদর্শ সংঘের সহ-সভাপতি মৌলভী হেলাল উদ্দিনত্রিপুরা, উপজাতীয় মুসলিম আদর্শ সংঘের সম্পাদক ধর্মান্তরিত মুসলিম ইব্রাহিম ত্রিপুরা, মুসলিম পাড়া মডেল একাডেমির শিক্ষক ধর্মান্তরিত মুসলিম সাইফুল ইসলাম ত্রিপুরা, আবু বক্কর ছিদ্দিক (পূর্ব নাম অতিরম ত্রিপুরা), খাগড়াছড়ির মোঃ আব্দুর রহিম (পূর্ব নাম ভিনসেন্ট চাকমা), মোঃ আব্দুর রহমান (পূর্ব নাম ভন্দ চাকমা), মোঃ ইব্রাহিম (পূর্ব নাম ভবাৎ চাকমা) প্রমুখ।

সম্প্রতি বান্দরবানের আলিকদমের এক টিলায় কলাবাগানের মধ্যে শিশু ও নারীসহ কয়েকজন সাধারণ জুম্মকে মোনাজাতের প্রশিক্ষণের ভিডিও প্রচারিত হয়। ভিডিওটিতে আলিকদম উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা একে এম আইয়ুব খান কর্তৃক মোনাজাত অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করতে দেখা যায়। এতে এসময় ৩ জন শিশু, বিভিন্ন বয়সের ৪ জন নারী, ১০/১১ জন বিভিন্ন বয়সের আদিবাসী পুরুষকে মোনাজাতের প্রশিক্ষণ দিতে দেখা যায়। মোনাজাতে বেশ কয়েকজন মুসলিম বাঙালিও অংশগ্রহণ করেন।
আলিকদম উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা একে এম আইয়ুব খান কর্তৃক ধারনকৃত ও প্রচারিত আরেক ভিডিওতে জানা গেছে, ইতোমধ্যে আলিকদম উপজেলার থানচি সড়ক সংলগ্ন ১১ কিলোমিটার নামক এলাকায় ধর্মান্তরিত মুসলিমদের নিয়ে ‘ইসলামপুর’ নামে একটি পল্লী গড়ে তোলা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে ‘মুসলিম পাড়া মডেল একাডেমি’। এই ধর্মান্তরিত মুসলিমরা যাতে নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ভুলে গিয়ে গোঁড়া মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সেই উদ্দেশ্যে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে মসজিদ ও মাদ্রাসা। ‘উপজাতীয় মুসলিম আদর্শ সংঘ, বাংলাদেশ’ নামে সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি এই ধর্মান্তরিত আদিবাসী মুসলিম পরিবারের তরুণীদের সরাসরি মুসলিম ছেলেদের সাথে বিয়ে দেয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। ১১ কিলো এলাকায় অন্তত ৪৫ পরিবার আদিবাসী ধর্মান্তরিত মুসলিম রয়েছে বলে জানা গেছে।
স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, মাত্র মাস দুয়েক আগে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের ছাঃলাওয়া পাড়ায় (শীলবান্ধা পাড়া) ৫ মারমা পরিবারকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। সেই ধর্মান্তরিত পরিবারগুলি হল– ১. অংঙৈসিং মারমা (পরিবারের সদস্য ৫ জন); ২. খ্যাইসাথুই মারমা (পরিবার সদস্য ৪জন); ৩. রেগ্যচিং মারমা (পরিবারের সদস্য ৬ জন); ৪. সিংনুমং মারমা (পরিবারের সদস্য ৫ জন), সাবেক মেম্বর, তার এক মেয়ে ১০-১৫ বছর আগে এক মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করে; ৫. লোইসাংমং মারমা (পরিবারের সদস্য ৭ জন)।
জানা গেছে, এরা কেউই জেনে-বুঝে বা আগ্রহী হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। তাদের আর্থিক দূর্বলতার সুযোগে সুকৌশলে তাদেরকে মুসলমান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রেগ্যচিং মারমা ও অংঙৈচিং মারমার দুই সন্তানকে ভালো ভবিষ্যতের প্রলোভন দেখিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে বিনিময়ে তাদেরকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। জানা গেছে, সোলার প্যানেল দেওয়ার নাম করে তাদের কাছ থেকে আইডি কার্ড সংগ্রহ করা হয় এবং এরপর তাদেরকে মুসলমান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
প্রধান হোতা ডাঃ ইউসুফ আলী ও মাওলানা একে এম আইয়ুব খান?
স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে, আলিকদমসহ বান্দরবানে আদিবাসী জুম্মদের ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণের সাথে সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে সক্রিয় ও তৎপর হিসেবে দেখা গেছে ডা: ইউসুফ আলী নামে এক বহিরাগত চিকিৎসক ও আলিকদম উপজেলা জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা একে এম আইয়ুব খানকে। তারা আদিবাসীদের অভাব-অনটনের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিনিয়ত আদিবাসীদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং গরীব-অশিক্ষিত আদিবাসীদের ধর্মান্তরের জন্য এফিড্যাভিটসহ আইনি ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ডাঃ ইউসুফ আলীর গ্রামের বাড়ি বগুড়ায়, তবে বর্তমানে কক্সবাজারে থাকেন। সেখানে ঈদগাহ মডেল হসপিটাল ও ডায়াবেটিস কেয়ার সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতা, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আবাসিক সার্জন হিসেবে দায়িত্বে আছেন। জানা গেছে, তিনি অত্যন্ত সুক্ষভাবে ও সুকৌশলে বান্দরবানের আলিকদমসহ বিভিন্ন এলাকায় যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন সেখানে আদিবাসী জুম্মদের ধর্মান্তরিতকরণে সক্রিয়ভাবে সাহায্য-সহযোগিতা, বুদ্ধি-পরামর্শ ও পৃষ্টপোষকতা দিয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকে, তিনি যেহেতু নিজে একজন চিকিৎসক এবং আর্থিকভাবে সমর্থ, সেকারণে অনেক সময় বিনা পয়সায় চিকিৎসার নামে অথবা কিছু আর্থিক সহযোগিতার নামেও আদিবাসীদের ধর্মান্তরিতকরণ করছেন।

ডা: মং এ নু চাক এর সাথে ক্যামেরাই ছবি তুলে তিনি গত ৩ জুন তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, We hate racism but believe in brotherhood (অর্থাৎ, আমরা বর্ণবাদ ঘৃণা করি, তবে ভ্রাতৃত্বে বিশ্বাস করি)। কিন্তু তিনি যে গরীব আদিবাসীদের সরলতা, দারিদ্র ও শিক্ষার অভাবের সুযোগ নিয়ে তাদেরকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার মধ্য দিয়ে মুসলিম বাঙালি বর্ণবাদ চাপিয়ে দিচ্ছেন এবং তাদের স্বকীয় সংস্কৃতির ধ্বংস করে চলেছেন সেই বোধ কি তিনি হারিয়ে ফেলেছেন? মধুর কথার ফুলঝুরিতে, মানব সেবার আড়ালে তিনি কি এই আধুনিক যুগেও মধ্যযুগীয় কায়দায় অত্যন্ত অমানবিক ও ঘৃণ্য কাজ করছেন না?
গত ২৮ মে ২০২০ তিনি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘আমাদের এক প্রিয় নওমুসলিমা পারভীন ত্রিপুরা। মানিকগঞ্জের এক মহিলা মাদ্রাসায় পড়ত। মা ও বর্তমান বাবা নও মুসলিম। সে মাদ্রাসায় পড়ালেখার কারণে তার তাকওয়া ছিল প্রশংসনীয়। বাবা-মা মুসলিম হলেও ইসলামি সংস্কৃতির চেয়ে ত্রিপুরা সংস্কৃতিকে প্রাধান্য বেশি দেয়। …তাকে একবার ছুটিতে এনে আর মাদ্রাসায় যেতে দেয় না। সে যেন বাইরে যেতে না পারে এজন্য তার বোরখাটা পুড়ে ফেলে বাবা। তাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। সে শর্ত দেয় পাত্রকে হাফেজ ও আলেম হতে হবে। কিন্তু তারা এক ছেলের সাথে তার অমতে বিয়ে ঠিক করে। সে বুঝতে পারে তার ইসলামের উপর চলা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন সেতার বান্ধবীর সাথে কথা বলে রাখে। ফজরের আগে উঠে বান্ধবীর বোরখা নিয়ে পালায়। … রাতে খবর পাই সে মাদ্রাসায় গিয়ে পৌঁছেছে। আমরা আশ্বস্ত হই। সে আর বাড়িতে আসে না।’
ডাঃ ইউসুফ আলী পরে এই পারভীন ত্রিপুরার সাথেই কক্সবাজারের ঈদগাহ কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা সালামাতুল্লাহ’র বিয়ের ব্যবস্থা করেন।
পারভিন ত্রিপুরার বিষয়ে ফেসবুকের কথোপকথনে জনৈক Hillary Try Mhvc মন্তব্য কলামে লেখেন, ‘দোয়া ত করি ৩/৫ বছর পর মেয়াদ শেষ হলে বাপের বাড়ি দরজায় সামনে আসবেন না পারভিন বেগম ত্রিপুরা আপা’। এর জবাবে, ডাঃ ইউসুফ আলী লেখেন, ‘কেন, অবশ্যই যাবে, শুদ্ধিকরণ মিশন নিয়ে যাবে। অলরেডি তার ছোটভাই কুরআন হিফজ শুরু করেছে।’ এখানে ডাঃ ইউসুফ আলী ‘শুদ্ধিকরণ মিশন নিয়ে যাবে’ বলে কী বোঝাতে চেয়েছেন? এটা কি এই সমস্ত পারভিন বেগম ত্রিপুরা বা চাকমা-মারমা ধর্মান্তরিত মুসলিমদের দিয়ে বেধর্মী বা অশুদ্ধ আদিবাসীদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করার মধ্য দিয়েই তিনি তথাকথিত শুদ্ধিকরণ মিশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেননি?
এই ডা: ইউসুফ আলীর নেতৃত্বেই আলিকদমের ধর্মান্তরিত আদিবাসী মুসলিমদের ‘ইসলামপুর’ নামক মুসলিম পাড়ায় মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়। সেখানে তিনি তার নেতৃত্বে কক্সবাজারের বায়তুশ শরফ থেকে ডাক্তারদেরকে নিয়ে এসে মাঝে মধ্যে বিনামূল্যে চিকিৎসা ব্যবস্থারও আয়োজন করেন।
ডা: ইউসুফ আলী তার ১৩ মে ২০২০ তারিখে ছবিসহ এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘ডানের বাচ্চা সাইমুনা ত্রিপুরা, পিতা-ওমর ফারুক ত্রিপুরা; বামের বাচ্চা আয়েশা ম্রো, পিতা-ইব্রাহিম ম্রো; মাঝখানে আমি বাঙালি। অনেক পার্থক্য, দুটি বড় মিল। প্রথম মিল আমরা মানুষ আর দ্বিতীয় মিল আমরা মুসলিম।’ বাচ্চা দুটিকে তিনি দুপাশে দুটি রেখে ছবি উঠেন। বাচ্চাগুলো এখনও অবুঝ, দেড়-দুই বছরের বেশি হবে না।
ডা: ইউসুফ আলীর অন্যতম সহচর হচ্ছেন মাওলানা একে এম আইয়ুব খান, যিনি আলিকদম উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদেরইমাম। জানা যায়, তিনি আলিকদমের ১১ মাইল এর ধর্মান্তরিত মুসলিমদের যাবতীয় বিষয় দেখাশোনা ও তত্ত্বাবধানসহ বান্দরবানেরআদিবাসীদের ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণের ক্ষেত্রে অন্যতম সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করে থাকেন। এই ধর্মান্তরকরণের প্রচার ও প্রসার কাজেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।
সম্প্রতি বান্দরবানের আলিকদমের এক টিলায় কলাবাগানের মধ্যে শিশু ও নারীসহ কয়েকজন সাধারণ জুম্মকে মোনাজাতের প্রশিক্ষণ ও দীক্ষা অনুষ্ঠানের ভিডিও প্রচারিত হয়। এতে ৩ জন শিশু, বিভিন্ন বয়সের ৪ জন নারী, ১০/১১ জন বিভিন্ন বয়সের আদিবাসী পুরুষকে দেখা যায়। এসময় বেশ কয়েকজন মুসলীম বাঙালিও অংশগ্রহণ করেন। এই মোনাজাত প্রশিক্ষণ ও দীক্ষা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মাওলানা একে এম আইয়ুব খান।

জানুয়ারি ২০১৯ এর দিকে ধারণকৃত এবং পরে ইউটিউবে প্রচারিত এক ভিডিওতে মাওলানা একে এম আইয়ুব খান বলেন, “..সম্মানীত দ্বীনী ভাইয়েরা, আপনারা যারা এই ভিডিওটি দেখতে পাচ্ছেন, আপনারা খুব খেয়াল করেন। কিছুদিন আগেও আমরা একটা ভিডিও দিয়েছিলাম। আমার আইয়ুব খান এই পেইজে। নও মুসলীমদের বান্দরবান উপজেলার আলিকদমের থানচি সড়কে আরকি, থানচি সড়কে এগারো কিলোতে কিছু আমাদের ভাইয়েরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাদের কিছু বাচ্চা, প্রায় ১৭-১৮ জন ছেলেদেরকে পড়ানো হচ্ছে মাদ্রাসায়। তাদের জন্য আমাদের এক দ্বিনী ভাই তার আব্বারই ইচ্ছার সোয়াবের জন্য এই যে আমাদের নও মুসলীম ভাইদের জন্য একটা মসজিদ আমরা নির্মাণ করেছি। এই যে আপনারা দেখতে পাচ্ছেন, এই মসজিদটি..”
তিনি আর বলেন, “…যদি কেউ কিছু করতে চান, আপনারা সরাসরি এসে করতে পারেন। এখানে কোন ধরনের অসুবিধা হবে না।আমরা এখানে সেনাবাহিনীদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছি এবং উনারা আমাদেরকে সহযোগিতা করেন।” তবে ইহা তদন্তের বিষয় যে, তারা তাদের এ কাজে আরও কার কার সহযোগিতা ও পৃষ্টপোষকতা গ্রহণ করছেন।
লক্ষ্য যখন জুম্ম নারী
জুম্মদের ধর্মান্তরিত করার এবং আধিপত্য বিস্তার ও জাতিগত নির্মূলীকরণের অন্যতম পন্থা হিসেবে লক্ষ্যভুক্ত করা হয় আদিবাসী নারীকে। ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা, অপহরণ, যৌন হয়রানি ইত্যাদি সহিংসতা ছাড়াও জুম্ম সমাজকে আঘাত করার অন্যতম উপায় হিসেবে বেছে নেয়া হয় তথাকথিত ভালোবাসা বা ছলনার ফাঁদে ফেলে জুম্ম নারীদের করায়ত্ত করা। আর জুম্ম নারীকে বিয়ে করা বা ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়া মানেই হচ্ছে তাকে সহজে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা।

এই সহিংসতা বা বিয়ে করে ধর্মান্তরিত করা- সবকিছুতেই সরকার বা প্রশাসন তথা রাষ্ট্রের উদাসীনতা, আশ্রয়-প্রশ্রয়, মদদ ও পৃষ্টপোষকতা থাকে। যে কারণে চুক্তির পূর্বে ও পরে শত শত জুম্ম নারী ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যাসহ নানা সহিংসতার শিকার হলেও কোন ঘটনারই যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক কালে ধর্ষণের অভিযুক্তদের কাউকে কাউকে গ্রেফতার করা হলেও শেষ পর্যন্ত তারা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায় না।
সম্প্রতি সহিংসতার পাশাপাশি, বাঙালি মুসলিমদের কর্তৃক ভালোবাসা বা ছলনার ফাঁদে ফেলে জুম্ম নারীদের বিয়ে করে ধর্মান্তরিত করা বা সমাজ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতা, যাকে বলা হচ্ছে ‘লাভ জিহাদ’, সেটা অনেক বৃদ্ধি পাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে অনেক জুম্ম নারী চরম প্রতারণার শিকার হচ্ছে এবং বিপদগ্রস্ত হচ্ছে।
অতি সম্প্রতি এমন প্রতারক ও বিকৃত রুচিসম্পন্ন এক মুসলিম যুবকের প্রতারণা তথাকথিত লাভ জিহাদের শিকার হয় আদিবাসী ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের এক শিক্ষিত নারী। ঐ মুসলিম যুবক প্রেমের অভিনয় করে উক্ত ত্রিপুরা নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্কও গড়ে তোলে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেসবের ভিডিও ফুটেজ ধারণ করে। একপর্যায়ে মুসলিম যুবকটি ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মেয়েটিকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করে পরিবার ও সমাজের অমতে বিয়েও করে। পরে ঐ যুবক ত্রিপুরা মেয়েটিকে বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত করার চেষ্টা করে। এসময় মেয়েটি ছেলেটির ভয়ংকর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে তার কাছ থেকে সরে আসার প্রচেষ্টা চালায়। আর এসময় মুসলিম যুবকটি তাদের শারীরিক সম্পর্কের ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে। ফলে মেয়েটি পারিবারিক ও সামাজিকভাবেগভীর সংকটের মধ্যে পড়ে।
গত ৩০ মে ২০২০ Pb Chakma Lxr Wangza তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে Ismail Abir এর একটি পোস্ট শেয়ার করেন। সেখানে Ismail Abir লেখেন, ‘হে মুসলিম যুবকেরা আমাদের “লাভ জিহাদ” চলবে। আমাদের তাকিয়া (মিথ্যাচার) হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ধর্মের মেয়েরা বুঝবে না। তাদের কাছে ভালোবাসা নামক অস্ত্র এমনভাবে প্রয়োগ করো যেন এরা বুঝতে না পারে। তাই আমাদের আগে যে মিশন ছিল সেগুলোকে আপডেট করতে হবে।

যেমন: ১। তাদের ব্লাকমেইল করুন; ২। (এটা অনেকের জন্য অপাঠ্য এবং অশ্রাব্য তাই দেয়া গেল না); ৩। ছলেবলে একবার হলেও বিছানায় নিন, আবার, যদি বিয়ে করতে পারেন তবে নিম্নের কাজ করুন- (১) বিয়ে করে ধর্মান্তর করুন ও হিন্দুদের মাঝে তাকে দিয়ে ইসলাম প্রচার করুন। (২) তাদের পেট থেকে কমপক্ষে ৫টা বা তার থেকে বেশি বাচ্চা জন্ম দিন। আর যদি পারেন একটা বাচ্চা পেটে দিয়ে ছেড়ে দিন। ওই মেয়ে আরেক মুসলিম খুজে নেবে, কোন হিন্দু তাকে গ্রহণ করবে না। (৩) যে কয়টা পারবেন সেই কয়টা বিধর্মীদের বিয়ে করবেন আর পেটে বাচ্চা দিয়ে ছেড়ে দিন।’
উল্লেখ্য যে, এ পর্যন্ত বহু আদিবাসী জুম্ম নারী এধরনের প্রতারণা বা লাভ জিহাদের শিকার হয়ে তাদের ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন। বস্তুত আদিবাসীদের প্রতি সহিংস দৃষ্টিভঙ্গি ও আদিবাসী নারীদের প্রতি পাশবিক লালসা থেকেই এই ধরনের চিন্তা ও ঘটনার জন্ম।
ধর্মান্তরিতকরণ কি জাতিগত নির্মূলীকরণেরই অংশ!
বাংলাদেশের সংবিধানে ‘ইসলাম’কে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। অপরদিকে সংবিধানে, ‘হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমান মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করবে’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১১ সালের শুমারী অনুযায়ী বাংলাদেশে মাত্র ৮.৫% ভাগ হিন্দু এবং মাত্র ১% ভাগ বৌদ্ধ, খ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মের লোক রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইসলাম যেন এই স্বল্প সংখ্যক ভিন্নধর্মী আদিবাসীদের অস্তিত্বও ধ্বংস করতে তৎপর হয়েছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামকে আদিবাসী জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করে ইসলামীকরণ করা এবং পার্বত্যাঞ্চল থেকে জুম্মদের জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের অন্যতম অংশ হিসেবে এই ধর্মান্তরিতকরণ চলছে বলে অনেক আদিবাসী জুম্মর অভিযোগ। এমনকি আরাকান, কক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলাকে নিয়ে একটি ইসলামী জঙ্গী গোষ্ঠীর নতুন একটি ইসলামিক রাষ্ট্র কায়েমের যে অভিপ্রায় ও ষড়যন্ত্র এটি তারই এক অংশ কিনা তাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।
বস্তুত দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই এই ইসলামীকরণের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তবে এই কার্যক্রম আরও জোরদার হয় আশির দশকের শুরুতে ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেশের সমতল অঞ্চল থেকে ৪-৫ লক্ষ বহিরাগত সেটেলার বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে জুম্মদের জায়গা-জমিতে বসতিদানের মধ্য দিয়ে। ১৯৮০ সালের দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার লংগদুতে সৌদি আরব ও কুয়েতের অর্থায়নে স্থাপন করা হয় ইসলামিক মিশনারী সংগঠন ‘আল রাবিতা’। এর রয়েছে হাসপাতাল ও কলেজ।
কার্যত এর প্রদান উদ্দেশ্য ইসলামী ভাবধারাকে সম্প্রসারিত করা, সেটেলার বাঙালিদের সহায়তা এবং আদিবাসী জুম্মদের ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণের প্রচেষ্টা চালানো। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক দেখা যায় মূলত জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথে। লংগদু ছাড়াও, রাঙ্গামাটির বরকল উপজেলায় এবং বান্দরবানের আলিকদম উপজেলায়ও এর হাসপাতাল রয়েছে বলে জানা যায়। ১৯৯০ সালে আল রাবিতা মিশনারী কেন্দ্র আলীকদমে ১৭ জন মারমাকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করে।
বস্তুত এই ধর্মান্তরিতকরণের ফলাফল বা পরিণতি যে আদিবাসী জুম্মদের সংখ্যালঘুকরণ, তাদের উপর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা তাদের সংস্কৃতি ধ্বংসকরণ, তাদের রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনধারায় ক্ষতিসাধন, জুম্ম অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণতকরণ, সর্বোপরি জুম্মদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে জাতিগতভাবে বিলুপ্তকরণেরই নামান্তর, তা বলাইবাহুল্য।
বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি ছবি অনলাইন থেকে সংগৃহীত বাঘাইছড়ি পৌরসভার উগলছড়ি গ্রামে ৬ বছরের এক কন্যা শিশুকে তুলে নিয়ে ধর্ষনের চেষ্টা চালিয়েছে উগলছড়ি ...