Latest News, Breaking News Today - Videos, Cricket, Business, Politics - Chakma Today | Chakma Today

This is default featured slide 1 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured slide 2 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured slide 3 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured slide 4 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

This is default featured slide 5 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.This theme is Bloggerized by Lasantha Bandara - Premiumbloggertemplates.com.

Thursday, October 1, 2020

বাঘাইছড়িতে ৬ বছরের শিশুকে ধর্ষনের চেষ্টা>>>

বাঘাইছড়ি প্রতিনিধি

ছবি অনলাইন থেকে সংগৃহীত

বাঘাইছড়ি পৌরসভার উগলছড়ি গ্রামে ৬ বছরের এক কন্যা শিশুকে তুলে নিয়ে ধর্ষনের চেষ্টা চালিয়েছে উগলছড়ি ৯ নং ওয়ার্ড এলাকার জসিম উদ্দিনের বখাটে ছেলে জিয়াউর রহমান (সাগর ১৮)।  শিশুটি নিউলাইল্যা ঘোনা সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণীর ছাত্রী। এবিষয়ে শিশুটির মা বাদী হয়ে বাঘাইছড়ি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বলে জানিয়েছেন।

শিশুটির মা  অভিযোগ করেন, কিছুদিন আগেও প্রতিবেশী জসিম উদ্দিনের বখাটে ছেলে জিয়াউর রহমান (সাগর) দোকানের পেছনে ডেকে নিয়ে চকলেটের লোভ দেখিয়ে ও ২০ সেপ্টেম্বর সকাল ১১ ঘটিকায় বাড়ীর আঙ্গিনা থেকে তুলে নিয়ে ঘরে টেলিভিশন দেখানোর প্রলোভন দেখিয়ে ২ বার পালক্রমে ধর্ষনের চেষ্টা চালায় এবং ধর্ষন চেষ্টার বিষয়ে কাউকে বললে মেরে ফেলার হুমকি দেয়। এতে শিশুটি মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। পরে শিশুটি তার মাকে ঘটনা খুলে বললে গ্রাম্য ডাক্তার আজগর আলীকে মেয়ের জ্বর ও শরীর ব্যাথার কথা উল্লেখ করে তার বাবা ঔষধ নিয়ে লোক লজ্জার ভয়ে ঘরেই চিকিৎসা করান। 

পরবর্তীতে শিশুটির মা ঘটনাটি বখাটে জিয়াউর রহমান সাগরের মা ও স্থানীয় কাউন্সিলর নুরুল হক তালুকদারকে জানালে বখাটে সাগর বাড়ী ছেড়ে পালিয়ে যায়। কাউন্সিলর ছেলের বাবাকে বিষয়টি অবগত করে বিচারের আশ্বাস দেয় কিন্তু ছেলে পলাতক থাকায় এখনো বিচার হয়নি। এদিকে শিশুটির মা বখাটের উপযুক্ত বিচারের জন্য আইনি সহায়তা চেয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন প্রতিরোধ সেল তথ্য সেবার জরুরী নাম্বার ১০৯তে ফোন করে বিষয়টি অবহিত করেন। পরে উপজেলা তথ্য সেবা কর্মকর্তার মাধ্যমে বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে ঘটনা জানালে নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান হাবিব জিতু বাঘাইছড়ি থানার ওসি আসরাফ উদ্দিনকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলেন।

বাঘাইছড়ি থানার দায়িত্ব প্রাপ্ত কর্মকর্তা সেকেন্ড অফিসার এসআই মোঃ আসাদুজ্জামান বলেন আমরা সংবাদ পাওয়ার পরপরই থানার এসআই রানা বড়ুয়াকে ঘটনাস্থলে পাঠাই তবে বখাটে পলাতক থাকায় তাকে আটক করা সম্ভব হয়নি। পরে ভিকটিমদের বক্তব্য শুনে তার পরিবারকে থানায় অভিযোগ দায়ের করতে বলা হয়।

বাঘাইছড়ি থানার ওসি মোঃ আসরাফ উদ্দিন ঘটনার বিষয় শিকার করে বলেন, ঘটনাটি আমরা শুনেছি তদন্তও করেছি ভিকটিমের পরিবার থানায় এসেছেন আমরা শীঘ্রই আইনী পদক্ষেপ গ্রহন করবো।

বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান হাবিব জিতু বলেন নারী ও শিশু নির্যাতনের বিষয়ে স্থানীয়ভাবে মীমাংসার কোন সুযোগ নেই। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পৌর কাউন্সিলরকে সতর্ক করা হয়েছে।

বাঘাইছড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মোঃ গিয়াস উদ্দিন মামুন বলেন, ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক শিশুটির পরিবারকে আইনি সহায়তায় উপজেলা আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগীতা করা হবে।

এদিকে শিশুটির মা কান্না জড়িত কন্ঠে বলেন, মেয়ের নির্যাতনের বিষয়ে আমি উপযুক্ত আইনী সহায়তা ও বিচার না পেলে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়া ছাড়া কোন উপায় থাকবেনা। 

সূত্রঃ অনলাইন।



Share:

পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি গড়ছে রোহিঙ্গারা

 


পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি গড়ছে রোহিঙ্গারা  মিয়ানমারের মংডু থেকে পাঁচ বছর আগে পাঁচ সন্তানসহ বাংলাদেশে আসেন আমির আলী ও আমিনা খাতুন দম্পতি। তারা এখন বান্দরবানের কাইছতলীতে বাড়ি তৈরি করছেন। ছবি: সঞ্জয় কুমার বড়ুয়া/স্টার   বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করার পাঁচ বছরের মধ্যেই একটি রোহিঙ্গা পরিবারের চার ছেলে, এক মেয়ে সবাই ভোটার হয়েছেন এবং পাহাড়ের নির্জন একটি এলাকায় দোতলা বাড়ি করছেন। স্বাভাবিকভাবেই  প্রশ্ন আসে— কত সহজে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করা যায়, স্থায়ী হওয়া যায়?  রোহিঙ্গা আমির আলীর পরিবার। আমির আলী জানান, তিনি তার স্ত্রী আমিনা খাতুন ও তাদের পাঁচ সন্তান প্রায় পাঁচ বছর আগে মিয়ানমারের মংডু থেকে বাংলাদেশে আসেন। তারা এখন বান্দরবানের কাইছতলীতে বসতি স্থাপন করেছেন।  সম্প্রতি ওই এলাকায় গেলে দেখতে পাই, আমিরের পরিবার যে জমিতে বসবাস করছেন, সেখানে তারা একটি দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করছেন।  আমির স্বীকার করলেন প্রায় দশ শতক জায়গার ওপর পরিবার নিয়ে তিনি আছেন এবং সেই জায়গাটি তিনি কারও কাছ থেকে কিনে নেননি।  ২০১৭ সালের আগে সীমান্ত অতিক্রম করে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে বসবাস শুরু করেছেন, আমির তাদেরই একজন এবং এটি তিনি অবলীলায় স্বীকার করেছেন।  স্থানীয় মো. সিরাজ বলছিলেন, ‘শুধু আমিরের পরিবার নয়, হলুদিয়া থেকে প্রান্তিক লেক পর্যন্ত এখন প্রায় ২০০ রোহিঙ্গা পরিবার রয়েছে। প্রতিনিয়ত এখানে নতুন নতুন রোহিঙ্গাদের দেখা যাচ্ছে।’  স্থানীয় এবং কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল,  স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় রোহিঙ্গারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করছেন এবং সেখানকার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারছেন।  ‘রোহিঙ্গা পরিবারগুলো বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির অধীনে যেমন: বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফসহ নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সরকারি ভাতা পান’, বলেন সিরাজ।  আমাদের দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়াও পাহাড়ে বসতি স্থাপন করা রোহিঙ্গাদের জন্য কঠিন কিছু না।  বেশ কয়েক বছর আগে মিয়ানমারের বুচিডং এলাকা থেকে আসা নূর নাহার বেগমও এখন বান্দরবানের সুয়ালক ইউনিয়নের হরিণ মারা এলাকায় বসতি স্থাপন করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।  নূর নাহার বলেন, ‘আমরা একজন স্থানীয়কে বছরে চার হাজার টাকার দিয়ে এই এলাকায় বসবাস করি।’  ‘হরিণ মারা এলাকায় ২২টি রোহিঙ্গা পরিবার ইতোমধ্যে বসতি স্থাপন করেছেন। তাদের অনেকেই বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্রও সংগ্রহ করেছেন। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত টাকা নেই বলে আমার স্বামী ও আমি এখনো কার্ডটি পাইনি’, বলেন নূর নাহার।  এই এলাকার জাফর আলম নামে একজনের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে যেটি ২০১৭ সালের ২ নভেম্বর বান্দরবান থেকে ইস্যু করা হয়েছিল। জাতীয় পরিচয়পত্রে জাফরের জন্মস্থান কক্সবাজার দেখানো হয়েছে এবং তার জন্ম সাল দেখানো হয়েছে ১৯৬৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি।  জাফরের প্রতিবেশী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘জাফর বেশ কয়েক বছর আগে মিয়ানমার থেকে এসে এই এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।’ জাফর এখন সেটি অস্বীকার করে বলছেন, তার জন্ম বাংলাদেশের কক্সবাজারে। বান্দরবানে এসে তিনি ভোটার হয়েছেন।  নাইক্ষ্যংছড়ির দোছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাবিবুল্লাহ বলেছেন, ‘দোছড়িতে প্রায় ৩০০ রোহিঙ্গা আছেন, যারা কয়েক বছর আগে এখানে এসেছেন।’  নাম প্রকাশ না করার শর্তে দোছড়ি এলাকার কয়েকজন স্থানীয় দাবি করেছেন যে, হাবিবুল্লাহর বাবা-মাও মিয়ানমার থেকে আসা।  এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘আমার বাবা-মা বহু বছর আগে কক্সবাজারের রামু এলাকায় থাকতেন। তবে, আমার জন্ম দোছড়িতে।’  জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় অনেকেই জানায়, প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা পরিবার বান্দরবান জেলায় বসতি স্থাপন করেছেন। এদের বেশিরভাগ নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, আলীকদম, রোয়াংছড়ি ও বান্দরবান সদরে রয়েছেন।  আলীকদম উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিন বলেন, ‘গত সাত-আট বছরে প্রায় ৫০০ রোহিঙ্গা পরিবার উপজেলায় বসতি স্থাপন করেছে এবং এখানে বার্মাইয়া বা বার্মিজ পাড়া নামে একটি গ্রামও রয়েছে।’  সুয়ালক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উ ক্যনু মারমা বলেন, ‘২০০৭-২০০৮ সালের আগে সুয়ালক এলাকায় রোহিঙ্গা ছিল না। কিন্তু, এখন এই এলাকায় প্রায় দুই শর বেশি রোহিঙ্গা পরিবার বাস করে।’  তিনি আরও জানান, এর মধ্যে এই এলাকার প্রায় ৫০টি রোহিঙ্গা পরিবার ভোটার তালিকায় নিবন্ধিতও হয়েছে।  পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান চ্যাপ্টারের সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় প্রশাসন কেবল রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন করতে সহায়তা করছে না, তারা তাদেরকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে এবং স্থায়ী বসবাসের সনদও দিচ্ছে।’  বান্দরবানের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সনদ দেওয়ার একটি সিন্ডিকেট রয়েছে।’  ‘২০১৯ সালে মূলত রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে আমরা প্রায় এক হাজার ৯০০টি আবেদন বাতিল করে দিয়েছি। কারণ আবেদনের সঙ্গে যেসব ডকুমেন্ট দেওয়া হয়েছিল, তাতেই আমাদের সন্দেহ হয়েছিল যে এই আবেদনকারীরা বাংলাদেশি নন’, যোগ করেন মোহাম্মাদ রেজাউল করিম।  তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাদের জন্ম সনদ দেন।’  এ বিষয়ে বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুব আলম বলেন, ‘সম্প্রতি বান্দরবানে রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপনের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। যারা বিভিন্ন সরকারি ভাতা পাচ্ছেন, তারা হয়তো এই অঞ্চলটিতে অনেক আগে এসেছিলেন।’  পার্বত্য চট্টগ্রামে রোহিঙ্গাদের ক্রমবর্ধমান বসতি স্থাপন সেখানকার পাহাড়িদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যকে আরও বেশি হুমকির মধ্যে ফেলবে বলে পাহাড়িরা মনে করছেন।  ১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সংকট চলছে, তার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাধ বসতি স্থাপন, পাহাড়ে বসবাসের স্থায়ী ঠিকানা দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সনদ প্রদানসহ  নানামুখী  কার্যক্রমে রোহিঙ্গাদের নাম সুকৌশলে নিবন্ধন এই অঞ্চলের পাহাড়িদের জন্য এক অশনিসংকেত বলে মনে করা হচ্ছে।  বান্দরবানে বিশেষ করে লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা বিভিন্ন সময় পাহাড়িদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগ রয়েছে। আরও অনেক জুমিয়া পরিবার উচ্ছেদ আতঙ্কে আছেন বলে জানা গেছে।  ২০১৬ সালে লামা উপজেলার ছোট কলার ঝিরি এলাকায় শহিদুল ইসলাম নামে একজন প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে ওই এলাকার ৮২টি ম্রো পরিবারের জুমের জায়গা দখলের অভিযোগ উঠেছিল। ওই এলাকায় রশিদ আহমেদ নামে একজন রোহিঙ্গা যিনি অর্থের বিনিময়ে ম্রোদের জায়গা দখল করতে গিয়েছিলেন তার সঙ্গে কথা হয়।  রশিদ জানান, শহিদুল প্রায় ২০-২৫ জন রোহিঙ্গাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল এবং তাদের  সেখানে থাকার ব্যবস্থা করেছিল। যেন ম্রোরা ভয়ে জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হন।  বিষয়টি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল 👇https://www.thedailystar.net/bangla/%E0%A6%B6%E0%A7%80%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%B7-%E0%A6%96%E0%A6%AC%E0%A6%B0/%E0%A6%AA%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A7%8D%E0%A6%AC%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF-%E0%A6%9A%E0%A6%9F%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%B8%E0%A6%A4%E0%A6%BF-%E0%A6%97%E0%A6%A1%E0%A6%BC%E0%A6%9B%E0%A7%87-%E0%A6%B0%E0%A7%8B%E0%A6%B9%E0%A6%BF%E0%A6%99%E0%A7%8D%E0%A6%97%E0%A6%BE%E0%A6%B0%E0%A6%BE-176481
মিয়ানমারের মংডু থেকে পাঁচ বছর আগে পাঁচ সন্তানসহ বাংলাদেশে আসেন আমির আলী ও আমিনা খাতুন দম্পতি। তারা এখন বান্দরবানের কাইছতলীতে বাড়ি তৈরি করছেন। ছবি: সঞ্জয় কুমার বড়ুয়া/স্টার 


বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রবেশ করার পাঁচ বছরের মধ্যেই একটি রোহিঙ্গা পরিবারের চার ছেলে, এক মেয়ে সবাই ভোটার হয়েছেন এবং পাহাড়ের নির্জন একটি এলাকায় দোতলা বাড়ি করছেন। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে— কত সহজে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করা যায়, স্থায়ী হওয়া যায়?


রোহিঙ্গা আমির আলীর পরিবার। আমির আলী জানান, তিনি তার স্ত্রী আমিনা খাতুন ও তাদের পাঁচ সন্তান প্রায় পাঁচ বছর আগে মিয়ানমারের মংডু থেকে বাংলাদেশে আসেন। তারা এখন বান্দরবানের কাইছতলীতে বসতি স্থাপন করেছেন।


সম্প্রতি ওই এলাকায় গেলে দেখতে পাই, আমিরের পরিবার যে জমিতে বসবাস করছেন, সেখানে তারা একটি দ্বিতল বাড়ি নির্মাণ করছেন।


আমির স্বীকার করলেন প্রায় দশ শতক জায়গার ওপর পরিবার নিয়ে তিনি আছেন এবং সেই জায়গাটি তিনি কারও কাছ থেকে কিনে নেননি।


২০১৭ সালের আগে সীমান্ত অতিক্রম করে যেসব রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে ক্যাম্পের বাইরে গিয়ে বসবাস শুরু করেছেন, আমির তাদেরই একজন এবং এটি তিনি অবলীলায় স্বীকার করেছেন।


স্থানীয় মো. সিরাজ বলছিলেন, ‘শুধু আমিরের পরিবার নয়, হলুদিয়া থেকে প্রান্তিক লেক পর্যন্ত এখন প্রায় ২০০ রোহিঙ্গা পরিবার রয়েছে। প্রতিনিয়ত এখানে নতুন নতুন রোহিঙ্গাদের দেখা যাচ্ছে।’


স্থানীয় এবং কয়েকজন রোহিঙ্গার সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহযোগিতায় রোহিঙ্গারা পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি স্থাপন করছেন এবং সেখানকার ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারছেন।


‘রোহিঙ্গা পরিবারগুলো বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন কর্মসূচির অধীনে যেমন: বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, ভিজিডি, ভিজিএফসহ নিয়মিতভাবে বিভিন্ন সরকারি ভাতা পান’, বলেন সিরাজ।


আমাদের দেশের জাতীয় পরিচয়পত্র পাওয়াও পাহাড়ে বসতি স্থাপন করা রোহিঙ্গাদের জন্য কঠিন কিছু না।


বেশ কয়েক বছর আগে মিয়ানমারের বুচিডং এলাকা থেকে আসা নূর নাহার বেগমও এখন বান্দরবানের সুয়ালক ইউনিয়নের হরিণ মারা এলাকায় বসতি স্থাপন করে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।


নূর নাহার বলেন, ‘আমরা একজন স্থানীয়কে বছরে চার হাজার টাকার দিয়ে এই এলাকায় বসবাস করি।’


‘হরিণ মারা এলাকায় ২২টি রোহিঙ্গা পরিবার ইতোমধ্যে বসতি স্থাপন করেছেন। তাদের অনেকেই বাংলাদেশের জাতীয় পরিচয়পত্রও সংগ্রহ করেছেন। আমাদের কাছে পর্যাপ্ত টাকা নেই বলে আমার স্বামী ও আমি এখনো কার্ডটি পাইনি’, বলেন নূর নাহার।


এই এলাকার জাফর আলম নামে একজনের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি এই প্রতিবেদকের হাতে এসেছে যেটি ২০১৭ সালের ২ নভেম্বর বান্দরবান থেকে ইস্যু করা হয়েছিল। জাতীয় পরিচয়পত্রে জাফরের জন্মস্থান কক্সবাজার দেখানো হয়েছে এবং তার জন্ম সাল দেখানো হয়েছে ১৯৬৫ সালের ১ ফেব্রুয়ারি।


জাফরের প্রতিবেশী ফাতেমা বেগম বলেন, ‘জাফর বেশ কয়েক বছর আগে মিয়ানমার থেকে এসে এই এলাকায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।’ জাফর এখন সেটি অস্বীকার করে বলছেন, তার জন্ম বাংলাদেশের কক্সবাজারে। বান্দরবানে এসে তিনি ভোটার হয়েছেন।


নাইক্ষ্যংছড়ির দোছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাবিবুল্লাহ বলেছেন, ‘দোছড়িতে প্রায় ৩০০ রোহিঙ্গা আছেন, যারা কয়েক বছর আগে এখানে এসেছেন।’


নাম প্রকাশ না করার শর্তে দোছড়ি এলাকার কয়েকজন স্থানীয় দাবি করেছেন যে, হাবিবুল্লাহর বাবা-মাও মিয়ানমার থেকে আসা।


এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাবিবুল্লাহ বলেন, ‘আমার বাবা-মা বহু বছর আগে কক্সবাজারের রামু এলাকায় থাকতেন। তবে, আমার জন্ম দোছড়িতে।’


জনপ্রতিনিধিসহ স্থানীয় অনেকেই জানায়, প্রায় তিন হাজার রোহিঙ্গা পরিবার বান্দরবান জেলায় বসতি স্থাপন করেছেন। এদের বেশিরভাগ নাইক্ষ্যংছড়ি, লামা, আলীকদম, রোয়াংছড়ি ও বান্দরবান সদরে রয়েছেন।


আলীকদম উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান কফিল উদ্দিন বলেন, ‘গত সাত-আট বছরে প্রায় ৫০০ রোহিঙ্গা পরিবার উপজেলায় বসতি স্থাপন করেছে এবং এখানে বার্মাইয়া বা বার্মিজ পাড়া নামে একটি গ্রামও রয়েছে।’


সুয়ালক ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উ ক্যনু মারমা বলেন, ‘২০০৭-২০০৮ সালের আগে সুয়ালক এলাকায় রোহিঙ্গা ছিল না। কিন্তু, এখন এই এলাকায় প্রায় দুই শর বেশি রোহিঙ্গা পরিবার বাস করে।’


তিনি আরও জানান, এর মধ্যে এই এলাকার প্রায় ৫০টি রোহিঙ্গা পরিবার ভোটার তালিকায় নিবন্ধিতও হয়েছে।


পার্বত্য চট্টগ্রাম বন ও ভূমি অধিকার সংরক্ষণ আন্দোলনের বান্দরবান চ্যাপ্টারের সভাপতি জুয়ামলিয়ান আমলাই বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে স্থানীয় প্রশাসন কেবল রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপন করতে সহায়তা করছে না, তারা তাদেরকে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করছে এবং স্থায়ী বসবাসের সনদও দিচ্ছে।’


বান্দরবানের জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ রেজাউল করিম বলেন, ‘পার্বত্য চট্টগ্রামে অর্থের বিনিময়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সনদ দেওয়ার একটি সিন্ডিকেট রয়েছে।’


‘২০১৯ সালে মূলত রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে আমরা প্রায় এক হাজার ৯০০টি আবেদন বাতিল করে দিয়েছি। কারণ আবেদনের সঙ্গে যেসব ডকুমেন্ট দেওয়া হয়েছিল, তাতেই আমাদের সন্দেহ হয়েছিল যে এই আবেদনকারীরা বাংলাদেশি নন’, যোগ করেন মোহাম্মাদ রেজাউল করিম।


তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা তাদের জন্ম সনদ দেন।’


এ বিষয়ে বান্দরবানের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহবুব আলম বলেন, ‘সম্প্রতি বান্দরবানে রোহিঙ্গাদের বসতি স্থাপনের কোনো তথ্য আমাদের কাছে নেই। যারা বিভিন্ন সরকারি ভাতা পাচ্ছেন, তারা হয়তো এই অঞ্চলটিতে অনেক আগে এসেছিলেন।’


পার্বত্য চট্টগ্রামে রোহিঙ্গাদের ক্রমবর্ধমান বসতি স্থাপন সেখানকার পাহাড়িদের সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ঐতিহ্যকে আরও বেশি হুমকির মধ্যে ফেলবে বলে পাহাড়িরা মনে করছেন।


১৯৯৭ সালে শান্তি চুক্তি হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামে যে সংকট চলছে, তার সঙ্গে রোহিঙ্গাদের পার্বত্য চট্টগ্রামে অবাধ বসতি স্থাপন, পাহাড়ে বসবাসের স্থায়ী ঠিকানা দেখিয়ে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব সনদ প্রদানসহ নানামুখী কার্যক্রমে রোহিঙ্গাদের নাম সুকৌশলে নিবন্ধন এই অঞ্চলের পাহাড়িদের জন্য এক অশনিসংকেত বলে মনে করা হচ্ছে।


বান্দরবানে বিশেষ করে লামা, আলীকদম ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলায় রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে প্রভাবশালী ভূমিদস্যুরা বিভিন্ন সময় পাহাড়িদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদের অভিযোগ রয়েছে। আরও অনেক জুমিয়া পরিবার উচ্ছেদ আতঙ্কে আছেন বলে জানা গেছে।


২০১৬ সালে লামা উপজেলার ছোট কলার ঝিরি এলাকায় শহিদুল ইসলাম নামে একজন প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ব্যবহার করে ওই এলাকার ৮২টি ম্রো পরিবারের জুমের জায়গা দখলের অভিযোগ উঠেছিল। ওই এলাকায় রশিদ আহমেদ নামে একজন রোহিঙ্গা যিনি অর্থের বিনিময়ে ম্রোদের জায়গা দখল করতে গিয়েছিলেন তার সঙ্গে কথা হয়।


রশিদ জানান, শহিদুল প্রায় ২০-২৫ জন রোহিঙ্গাকে সেখানে নিয়ে গিয়েছিল এবং তাদের সেখানে থাকার ব্যবস্থা করেছিল। যেন ম্রোরা ভয়ে জায়গা ছেড়ে অন্য জায়গায় চলে যেতে বাধ্য হন। বিষয়টি নিয়ে দ্য ডেইলি স্টারে বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল।

Rohingya Settlement in Chittagong

Share:

Wednesday, August 12, 2020

চাকমা হরফ নিয়ে কিছু অপ্রিয় বচন - শুভ্র জ্যোতি চাকমা

 

চাকমা হরফের ব্যবহার নিয়ে আমি খুবই আশাবাদী এবং হঠাশ- দু’টোই। ঘাবড়ে গেলেন ? আচমকা কথা শুনলে ঘাবড়ে যাওয়া স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রত্যাশা করছি এ প্রবন্ধটি পাঠের মধ্য দিয়ে ঘাবড়ে যাওয়ার উত্তর বা জবাব যা-ই বলি না কেন পাওয়া যাবে। আমার উত্তর বা জবাব বা যুক্তি কারোর অপছন্দের পাশাপাশি খারাপও লাগতে পারে। কেউ কেউ হতে পারেন বিব্রত। দু’টো বিষয় একেবারে পরস্পর বিরোধী। এর কারণ কী সেটি খুলেই বলি। পূর্বের চেয়ে হরফগুলোর ব্যবহার-চর্চা বহুগুণে বৃদ্ধি পাওয়াসহ সরকারিভাবে পাঠ্যবই মুদ্রণ ও পঠনের ব্যবস্থাকরণ আশাবাদী হওয়ার প্রধান এবং অন্যতম কারণ। অপরদিকে হরফগুলোর নিয়ম-শৃঙ্খলাহীন ব্যবহার-প্রয়োগ, নব নব নিয়ম চালুকরণের ব্যক্তিক উদ্যোগ বা প্রচেষ্টা, নিত্য নৈমিত্তিক চিহ্নের উদ্ভাবন-প্রয়োগ হচ্ছে হঠাশার কারণ। হরফগুলোর ব্যবহারে ব্যক্তিগত অভিমতের প্রতিফলন ইতিমধ্যে নানাভাবে প্রতিভাত হয়েছে। আগামীতেও এ ধরনের প্রতিফলন হামেশাই দেখা যাবে তা নিশ্চিত করে বলতে পারি। আমার অনেক লেখায় এ বিষয়ে কোনো কোনো অসঙ্গতি ও অযৌক্তিক দিক তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। যার কারণে অনেকের অপছন্দের তালিকায় আমার স্থান হয়েছে সেটি অনুমান বা অনুভব করতে পারি। বছর তিনেক আগের ঘটনা। এক ফেসবুক বন্ধু যিনি নিজেকে চাকমা হরফ ও ভাষাবিশেষজ্ঞ এবং প্রখ্যাত লেখক মনে করেন আমাকে আনফ্রেণ্ড করার পাশাপাশি ব্লগও করে দিয়েছেন। কী অবাক কাণ্ড দেখুন তো ? ভুলভাল লিখবেন কিন্তু সেগুলিকে ভুল বলাও যাবে না। মুখবুঝে মেনে নিতে হবে-এটাই তো তারা চায়, পছন্দ করে। মানুষ নামক জীবেরা বড়ই অদ্ভুদ ! শুধুমাত্র প্রসংশাই খোঁজে-পেতে চায়। সমালোচনা সহ্য করতে পারে না। ব্যক্তিগত স্বার্থ এবং মতকে প্রাধান্য দিয়ে যারা নিজের মতকে প্রতিষ্ঠা করতে চায় অধিকন্তু যারা নিজেদের গোজা ও গোষ্ঠীতে প্রচলিত শব্দ ও উচ্চারণকে(আমি ঐ সকল শব্দ ও উচ্চারণকে চাকমা আঞ্চলিক শব্দ হিসেবে গণ্য করি) প্রতিষ্ঠা করতে চায় তাদের পছন্দের তালিকায় আমার অনুপস্থিতি আমি নিজেই পছন্দ করি। কারণ উভয়ের জন্য এটি বিব্রতকর। আরও উদ্বেগের কারণ হচ্ছে এ শ্রেণিদের প্রচেষ্টা প্রতিনিয়ত বাড়ছে বৈ কমছে না। সামগ্রিকভাবে আমাদেরকে গভীর চিন্তায় ফেলে দেয়। ক্ষণিকের জন্য দিশাহীন হয়ে পড়ি। আমাদের ভাষা ও হরফের অগ্রগতির পথে এগুলো নি:সন্দেহে অন্তরায়। আমরা কি একবারও ভেবে দেখেছি গোজাভিত্তিক শব্দ ও উচ্চারণ প্রয়োগ অব্যাহত থাকলে আমাদের ভাষাকে স্ট্যাণ্ডার্ড পয্যায়ে উপনীত করা দুরূহ হবে ? ভেবে না থাকলে এখনিই ভাবা শুরু করতে হবে। একটি সর্বজনগ্রাহ্য সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারলে আগামী প্রজন্মের কাছে এগুলো দুর্বোধ্যতার দৃষ্টান্ত হিসেবে থেকে যাবে। এর কারণ উচ্চারণের নিরিখে বর্ণের ব্যবহার ও প্রয়োগ এবং বানান নির্ভর করে থাকে। একটু খেয়াল করে দেখবেন পূর্বে ব্যবহৃত অনেক বানান ও চিহ্নকে সমসাময়িক সময়ে এসেও অনেকে সেগুলিকে অন্ধভাবে অনুসরণ করে চলেছেন। তথাগত বুদ্ধের অমীয় বাণীর ন্যায় সত্য মনে করেন। বুচ্চি উ-কে কেউ কেউ বলছেন উচ্চি উয়া। কারণ বচ্চি উ-এর নিচে কোনো কোনো বৈদ্যালি পুঁথিতে একটান চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে। সুতরাং ব্যক্তিগত ইচ্ছাকে প্রতিফলন করার সময় অযৌক্তিক বা চাকমা হরফগুলোর নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের নিয়ম বহির্ভুত কোনো চিহ্ন ব্যবহার করা হচ্ছে কি না সেদিকে সতর্ক থাকা উচিত। যদি করা হয় সেগুলো পরবর্তী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয় এবং অনুসরণীয় হবে এটি অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে। চাকমা ভাষা ও হরফ নিয়ে আমরা এমন কোনো বিতর্কিত বিষয় বা সিদ্ধান্ত রেখে যেতে চায় না যাতে আমাদের ভাবী প্রজন্মরা সেটিকে নিয়ে বিব্রতকর অবস্থায় পতিত হয় বা সমাধানহীন সমস্যায় মুখোমুখি হয়।
 পছন্দসই এবং স্বজাতীয় যে কোনো জিনিসের প্রতি ভালবাসা, ভাললাগা থাকা মানুষের স্বভাবজাত অন্যতম বৈশিষ্ট্য। স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্যের কারণে ভাললাগা কোনো জিনিসের ওপর কোনো সমালোচনা, কুটবাক্য বা যে কোনো ধরনের আঘাত মানুষ সহ্য করে না, করতে পারে না। এক্ষেত্রে চাকমারা আরও একধাপ এগিয়ে রয়েছেন বলে মনে করা হয়। তারা সমালোচনা সহজে গ্রহণ বা হজম করতে চান না, গ্রহণ করেন না। অনেক ভিনজাতীয় মানুষের নিকট থেকেও এ জাতীয় মন্তব্য প্রায়শ শোনা যায়। এটি নি:সন্দেহে নেগেটিভ দিক এবং গ্রহণ অযোগ্য অপবাদ। সুতরাং এ জাতীয় বিষয়কে হেলায় না নিয়ে সেটির বিষয়ে গভীরভাবে ভাবা উচিত যাতে অপবাদ ঘুচানো যায়। আমাদেরকে গঠনমূলক সমালোচনা গ্রহণ বা হজম করবার সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতার মধ্য দিয়ে এগুতে হবে নচেৎ কোনো বিষয়ে উৎকৃষ্ট ফলাফল আশা করা বৃথা হবে। আমি মনে করি চাকমা হরফগুলোর উন্নয়ন ও প্রসারে যারা কাজ করে যাচ্ছেন তাদের কাজের গঠনমূলক সমালোচনা করা জরুরিভাবে প্রয়োজন। তা না হলে একপেশে ফলাফলই আসবে যা এযাবৎ আমরা পেয়েই চলেছি। যার কারণে চাকমা হরফের ব্যবহার নিয়ে সুনির্দিষ্ট পন্থা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়নি। খেয়াল করুন-অদ্যাবধি আমরা আমাদের হরফের সঠিক সংখ্যা কয়টি হওয়া উচিত সেটিও ঠিক করতে পারিনি। যে যার মত হরফ শিক্ষার বই প্রকাশ করছি মাত্র। অনেকে যার যার ধারা মোতাবেক শিখনের কাজও সম্পাদন করছেন। শিখনের কাজটিকে আমি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করতে চাই। তবে ব্যক্তি বিশেষে শিখনের কাজে রয়েছে নানা পার্থক্য। হরফের আকৃতিতে মৌলিক কোনো পার্থক্য না থাকলেও চিহ্ন প্রয়োগ ও ব্যবহারে রয়েছে উল্লেখযোগ্য ভিন্নতা। ফলশ্রুতিতে বানানের প্রসঙ্গতি আরও দুর্বোধ্য হয়ে যায়। একটি ঘটনা এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক মনে করছি।
 আমাদের ইনস্টিটিউটের কোনো একটি ব্যাচের চাকমা শিক্ষার্থীদের পঠন সুবিধার্থে আমি বন্ধুবর শুভাশীষ-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত ‘করোদি’ নামক পত্রিকার কিছু কপি শিক্ষার্থীদের কাছে দিই। পরে ফলোআপ করে জানলাম যে, শিক্ষার্থীরা কিছু কিছু শব্দ পড়তে সক্ষম হচ্ছে না। কারণ সেই সব শব্দে কিছু চিহ্ন ব্যবহার করা হয়েছে যেগুলো তারা চিনে না। তাদের শেখানো হয়নি। চিহ্নগুলোর অন্যতম হচ্ছে ‘ডেইলদ্যা’। এ চিহ্নটি রাঙ্গামাটির কোনো প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি চাকমা হরফ শিখনের কাজে প্রয়োগ করেন না। আমরা লক্ষ করছি এভাবে অঞ্চলভেদে পার্থক্য সৃষ্টি হচ্ছে। দৃশ্যমান পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় ত্রিপুরা, মিজোরাম এবং বাংলাদেশে আমরা যারা চাকমা হরফ চর্চা করছি তাদের মধ্যে। আশা করি এতক্ষণ নিশ্চয় বুঝতে পেরেছেন আলোচ্য প্রবন্ধটির লিখন উদ্দেশ্য। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে যে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা সম্ভব হবে তা প্রত্যাশা করাও কল্পনাতীত। আমাদের মনে রাখা দরকার, হরফগুলোর ব্যবহারে নীতিমালা প্রণয়ন করা সম্ভব না হলে বানানরীতিও প্রণয়ন করা সম্ভব হবে না। তবে সমালোচনা হওয়া উচিত গঠনমূলক ও যৌক্তিক সহকারে এবং তা হওয়া উচিত অবশ্যই লিখিতভাবে। অনেকে শুধুমাত্র কথার মধ্য দিয়ে সমালোচনার ফুলঝুড়ি ঝেরে থাকেন। এতে কথাবার্তাগুলোর বিকৃতি ঘটে মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝির সৃষ্টি হয়ে থাকে। যে কোনো বিষয়ে মতদ্বৈততা লিখিতভাবে তুলে ধরা হলে পরবর্তীতে যারা কাজ করবেন তাদেরও অনেকখানি সহজ হয়ে থাকে। চাকমা হরফগুলোর অগ্রগতি চান তো এগুলোর অযৌক্তিক ব্যবহার, প্রয়োগ নিয়ে লিখিতভাবে সমালোচনা করুন। বিগত সময়ের অভিজ্ঞতা বলে, চাকমা হরফ ব্যবহারকারীদের মধ্যে নানা মত-দ্বিমত থাকলেও তা অনেকে লিখিতভাবে প্রকাশ করেন না। শুধুমাত্র কথার বুলিতেই তাদের যৌক্তিকতা খুঁজে পান। এ যৌক্তিকথা প্রকাশের ক্ষেত্র হচ্ছে কোনো সভা। ফলে শুধুমাত্র মত-অভিমত প্রকাশ করতে করতেই সভাটির কায©ক্রম শেষ হয়ে যায়। কাজের কাজ কিছুই হয় না। আমি মনে করি চাকমা হরফগুলোর আদি বৈশিষ্ট্য অধিকন্তু আধুনিক ভাষা প্রকাশে(যে কোনো ভাষা হতে পারে) হরফগুলোর বৈশিষ্ট্য বা ব্যবহারবিধি কী হওয়া উচিত সে নিয়ে সুচিন্তিত বিশ্লেষণধর্মী মতামত লিখিতভাবে তুলে ধরা প্রয়োজন ।
 নিজস্ব হরফ নিয়ে গৌরবান্বিত ও আশাবাদী হওয়া একেবারে স্বাভাবিক ব্যাপার। অনেকের ন্যায় আমিও বেশ আশাবাদী। আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি আমাদের হরফগুলো আমাদের ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতীক। আমাদের বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পাশাপাশি হরফগুলো আমাদের সুদূর অতীতের গৌরবময় ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। চাকমাদের অতীত ইতিহাস যে অত্যন্ত প্রজ্জ্বল ছিল হরফগুলো তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। এজন্য হরফগুলো ব্যবহারে একটি সুষ্ঠু ও সর্বজন গ্রহণীয় ধারা প্রণয়ন করা যুগের দাবি হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে তাহলে হরফগুলো নিয়ে হঠাশার সুর কেন ? উত্তর খুবই স্বাভাবিক-চাকমা হরফগুলো নিয়ে উচ্চাকাঙ্খা আছে বলে নেগেটিভ ও পজেটিভ দিকসমুহ আমলে নিয়ে তুলে ধরার চেষ্টা করি যাতে হরফগুলোর ব্যবহারিক গাঁথুনি মজবুত এবং যৌক্তিক হয়। হঠাশ হওয়া নিয়ে অনেকের মনে প্রতিক্রিয়াসহ নানা প্রশ্ন-উদ্বেগও অনেকের মনে সৃষ্টি হতে পারে যা খুবই স্বাভাবিক। যদি বলি প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করানোর জন্যই এ লিখনি ! আসলেই তা-ই। আমি চাই প্রতিক্রিয়া সৃষ্টির মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে আরও অনেকে লিখবেন, গুরুত্বপূর্ণ মতামত তুলে ধরবেন। সৃষ্টি হবে অনেক লিখনির। চাকমা হরফগুলো নিয়ে অজস্র মতামত প্রতিফলিত হবে। সকল মতামতকে বিচার-বিশ্লেষণ করে সংশ্লিষ্ট গবেষকেরা নতুন দিশা জাতিকে দেবেন। প্রসঙ্গ যে, হরফগুলো নিয়ে আমি ইতিপূর্বে দীর্ঘ-নাতিদীর্ঘ বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। সে সব প্রবন্ধে আমি হরফগুলোর আদি উৎস, বৈশিষ্ট্য, প্রাচীন ব্রাহ্মী হরফগুলোর সাথে কোনো কোনো হরফের বিদ্যমান সাদৃশ্য এবং বিভিন্ন লেখকের মত-অভিমত তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলাম। (পড়ুন-চাকমা বর্ণমালার ব্যবহার : অতীত ও বর্তমান, চাকমা হরফের সংখ্যা কত ?, চাকমা বর্ণমালা : ছড়িয়ে পড়ুক সবখানে ইত্যাদি প্রবন্ধ) সাম্প্রতিক সময়ে চাকমা হরফের ব্যবহার, সংস্কার নিয়ে অনেকের নানা মত-অভিমত আমার নজর এড়ায়নি। নিরলস পরিশ্রম করে অনেকে আমাদের হরফগুলোকে উন্নয়নের দিকে ধাবিত করার শত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিজস্ব চিন্তা ও মেধায় তারা কিছু কিছু সংস্কার ও নানা ধরনের চিহ্ন ব্যবহারে আগ্রহ দেখিয়েছেন। সন্দেহ নেই তারা চাকমা হরফগুলোর অগ্রগতির স্বার্থেই সংস্কার আয়নের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। যুগের চাহিদা মেটানোর জন্য সংস্কার আনয়ন অপরিহায্য। এ বিষয়ে আবারও লিখতে বসতে হলো এ কারণে যে, অনেক মত-অভিমতের সাথে আমি পুরোপরি একমত হতে পারি না। যেমনটি গ্রহণ করতে পারিনি সরকারিভাবে প্রকাশিত পাঠ্য উপকরণাদিতে যে সকল সংস্কার সংশ্লিষ্টরা সংযুক্ত করেছেন। যেমন-বইগুলোর প্রচ্ছদে তারা ম শব্দটি লিখতে গিয়ে বুগতপদলা মা হরফটির ওপরে একটান চিহ্ন দেয়ার পরও পাশে একটি কমা ব্যবহার করা করেছেন। শুধুমাত্র একটিতে নয় পুরো ৪টি শ্রেণির জন্য মুদ্রিত বইয়ে একই চিহ্ন প্রয়োগ করা হয়েছে। এ বিষয়ে কোনো যুক্তি আছে কী ?
 প্রসঙ্গত যে, বাংলা হরফে চাকমা ভাষা লিখার সময় বিগত শতকের সত্তর দশকে চাকমা সাহিত্যিকদের কেউ কেউ এ ধরনের চিহ্ন ব্যবহার শুরু করেছিলেন। আলোচ্য পাঠ্য বইগুলোতে মাজ্যাপাতের নিয়ম চুরমার করা হয়েছে। তাদের লিখন বৈশিষ্ট্য পয্যালোচনায় বুঝা যায় যে তারা সকল হরফে মাজ্যা চিহ্ন ব্যবহারে পক্ষপাতি। আমরা অনেকেই জানি, চাকমা ভাষার শুদ্ধ উচ্চারণ ও বানানরীতিকে সুনির্দিষ্ট কাঠামোর মধ্যে নিয়ন্ত্রণ করে রাখে চাকমাদের মাজ্যাপাত। মাজ্যা চিহ্নটি হরফের ডানপাশের ওপরে বসে। এটি অনেকটা বাংলা রেফ্-এর ন্যায়। অথচ গুরুত্বপূর্ণ এ চিহ্নটিকে মানার কোনো ধার ধারেননি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। অপরদিকে ভারত থেকে চাকমা হরফে যে সকল প্রকাশনা প্রকাশ করা হচ্ছে সেগুলোতে মাজ্যাপাত এতই কঠোরভাবে মান্য করা হচ্ছে যে স্বয়ং বুদ্ধ শব্দটিই বিকৃত করা হচ্ছে। চাকমা হরফে তাদের বানানটি ‘বুত্ধ’। ‘বুদ্ধ’ উচ্চারণ করতে করতে অভ্যস্ত হওয়া আমাদের জিহ্বায় এটিকে উচ্চারণও সম্ভব হয়ে ওঠে না। সারা পৃথিবীজুড়ে সকল ভাষায় বুদ্ধ শব্দটি অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারণ করা হয়। অথচ মাজ্যাপাত মেনে চলার কারণে শব্দটিকে বিকৃতি করা হচ্ছে। এটি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। মাজ্যাপাত এখানে উন্মুক্ত করে দিতে হবে। শুধু তাই নয় নামবাচক ও জাতিবাচক বিশেষ্যর ক্ষেত্রেও মাজ্যাপাত উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তা না হলে চিরাচরিত নামগুলো বিকৃত হবে। যেমন-কারোর নাম যদি শুভাশীষ হয় তাহলে মাজ্যাপাতের নিয়ম মেনে চলার জন্য কি শেষ বর্ণটির জায়গায় ‘চ’ বর্ণটি গ্রহণ করা যুক্তিসম্মত হবে ? না, কোনো অবস্থাতে সেটি গ্রহণ অযোগ্য। এজন্য ভিনজাতীয় ভাষার শব্দ, নামবাচক ও জাতিবাচক বিশেষ্যর ক্ষেত্রে মাজ্যাপাত উন্মুক্ত করতেই হবে। এছাড়া লক্ষ করা গেছে সরকারি পাঠ্যবইগুলোতে উল্লেখযোগ্য হারে বাংলাশব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। ঐতিহ্যগতভাবে চলমান ‘অঝাপাত’কে বিভক্ত করে ‘আবযুগি পাত’ ও ‘অঝাপাত’ নামে দু’টি ভাগে বিভক্ত করার প্রয়াস পেয়েছেন। শুধু তাই নয় কেউ কেউ মৌলিক অঝাপাতকে ‘গাইমাত্যা পাত’ এবং ‘বলেমাত্যেপাত’ নামেও অভিহিত করছেন। এ ধরনের তথাকথিত প্রয়াস বাংলার স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ পাঠকে অনুসরণ করার ফলশ্রুতি বৈ কিছু নয়। তথাকথিত পাণ্ডিত্যের প্রতিফলন হিসেবে মাজারাগুলোকে অনেকে বলছেন ‘লেবাং’। ফলাগুলোকে বলা হচ্ছে পরশাল্য। সাম্প্র্র্রতিক সময়ে জামাহরফ(যুগ্মবর্ণ) এবং যদাহরফ(যুক্তবর্ণ) সৃষ্টিসহকারে ব্যবহার করার প্রয়াস চলছে। এ সকল বর্ণপ্রণেতাগণের যুক্তি হচ্ছে বিদেশি ভাষাকে চাকমা হরফে লিখনের জন্য জামাহরফ এবং যদাহরফ অবশ্যই দরকার। জানিনা জামাহরফ এবং যদাহরফগুলোকে কীভাবে উচ্চারণ করা হবে। কারণ চাকমা হরফগুলো আ-কারান্ত। জামা বা যদা হরফগুলোকে সরলভাবে লিখনের জন্য চাকমা হরফে মাজ্যা নামে একটি স্বতন্ত্র চিহ্ন রয়েছে। এ মাজ্যা চিহ্ন দিয়ে জামা বা যদা হরফগুলো আলাদা করা যায়। যে কোনো ধরনের যুক্তি দাঁড় করানো হোক না কেন এ ধরনের উদ্যোগের সাথে আমি কোনোভাবে একমত হতে পারি না। চাকমা হরফগুলোর যে বৈশিষ্ট্য তাতে জামা বা যদাহরফ সমর্থনযোগ্য নয়। এ ধরনের উদ্যোগ চাকমা হরফগুলোর চিরায়ত বৈশিষ্ট্যের পরিপন্থি। আর যদিই জামা বা যদাহরফ ব্যবহারকে সমর্থন করি তাহলে চিরাচরিত মাজ্যা চিহ্নটিকে তো বিলুপ্তি করে দিতে হবে। বলুন, এটি কি সম্ভব ? এজন্য বলি, চাকমা হরফগুলোর বৈশিষ্ট্যকে বাদ দিয়ে বা বিলুপ্তি ঘটিয়ে যে মত-অভিমত দাঁড় করানো হোক না কেন তা কোনোভাবে সমর্থনযোগ্য হতে পারে না। গণতন্ত্রের মত এখানে বিকল। মেধা এখানে অর্থহীন। প্রাসঙ্গিকভাবে উল্লেখ্য যে, ভিনজাতীয় ভাষার কিছু শব্দকে লিখনের জন্য রাঙ্গামাটিস্থ সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট-এর চাঙমা পত্থম পাঠ(Chakma Primer) নামক বইটিতে রা-ফলা, য়্যা-ফলা ছাড়াও তিনটি ফলা গ্রহণ করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে-না-ফলা, হা্-ফলা এবং লা-ফলা। আলোচ্য এ তিনটি ফলা ভিনজাতীয় ভাষা শুদ্ধভাবে লিখনের জন্য যথেষ্ট সহায়ক বলে মনে হয়। আরও একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে এ প্রসঙ্গতি থেকে বিদায় নেব। চাকমা হরফে শুদ্ধ বানান লিখনের জন্য আমাদের কোনো একজন একটি নিয়ম চালু করার চেষ্টা চালাচ্ছেন। আমার অতি ক্ষুদ্র জ্ঞানে মনে হয়েছে যে, তার উদঘাটিত নিয়মটি অনুসরণ করতে হলে আমাদেরকে সর্বপ্রথমে বাংলাভাষা ও বানান বিষয়ে সুদক্ষ হতে হবে। অর্থাৎ আগে বাংলাভাষা ভালভাবে আয়ত্ব করেই চাকমা ভাষার বানান শিখতে হবে।
 অনেক মতের সাথে একমত হতে না পারা আমার জ্ঞানের স্বল্পতা যে হবে না তা হলফ করে বলতে পারি না। অধিকন্তু সে সকল মতকে তাত্ত্বিকতার তত্ত্ব দিয়ে মোকাবেলা করার মত জ্ঞান আমার নেই। ব্যবহারিক প্রয়োগতত্ত্বই হচ্ছে আমার যৌক্তিকতা। বাস্তবতার নিরিখে তথ্য-তত্ত্ব উপস্থাপন করাই হচ্ছে আমার লিখনির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। প্রবন্ধের পরবর্তী অনুচ্ছেদে এ বিষয়ে আরও কিছু যোগ করবো। যা হোক আমি মনে করি মত-অভিমত থাকতেই পারে এবং তা দোষণীয় কিছু নয়। মত-অভিমত প্রকাশ করার নামই হচ্ছে গণতন্ত্র। মত-অভিমত প্রকাশের স্বাধীনতা সবার রয়েছে। গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় সবার মত প্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান স্বীকৃত। এজন্য কারোর মত-অভিমতকে গলা টিপে ধ্বংস করা বা বাঁধাগ্রস্ত করা যায় না। আবার মত প্রকাশের স্বাধীনতাও যেন কারোর মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব না করে, বাঁধাগ্রস্ত না করে, সত্যকে আড়াল না করে, সরল বিষয়কে জটিল না করে তোলে, চলমান একটি সচলে ঐতিহ্যবাহী ধারাকে বাঁধাগ্রস্ত ও অসম্মান না করে সেদিকে সুক্ষ্মদৃষ্টি রাখা দরকার। আমার মনে হয় চাকমা হরফগুলোর ব্যবহার নিয়ে আরও গভীরভাবে চিন্তা করার প্রয়োজন আছে। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ এক্ষেত্রে কায্যকর ভূমিকা রাখতে বেশি সহায়ক হবে তাতে সন্দেহ নেই। কারণ চাকমা হরফগুলো নিয়ে এযাবৎকালে যে ধরনের ব্যবহারবিধি, নিয়মনীতি, মত-অভিমত ব্যক্তি বিশেষে সৃষ্টি করা হয়েছে বা প্রকাশ করা হয়েছে অন্যান্য হরফগুলোর ক্ষেত্রে তার সিঁকিভাগও নজরে আসেনি। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক যে, কোনোকিছুতে একমত হতে হলে আমাদের প্রচুর সময়ের প্রয়োজন হয়ে পড়ে। অনেকক্ষেত্রে একমত হতে পারি না। অযৌক্তিক হলেও নিজের অবস্থান থেকে কেউ সরে আসতে চায় না। এ ধরনের দৃষ্টান্ত বা পরিস্থিতি কি প্রমাণ করে না যে চাকমা হরফ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা খুবই বেশি ? এজন্য বলি যৌক্তিকতার মধ্য দিয়ে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে। যৌক্তিকতা না মানলে প্রত্যাশিত ফলাফল পাওয়া যাবে না।
এবার নিজের অক্ষমতার কিছু কথা কই। স্বীকার করে নিই, ইতিহাস সে যে বিষয়েরই হোক না কেন তা আমার অতটা জানা নেই। আমার অনেকগুলো বিষয়ের মধ্যে প্রচণ্ড রকমের দুর্বলতার বিষয় এটি। শিক্ষাজীবনে আধাআধি বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান বিভাগে আ্যাকাডেমিক পড়াশুনার অভ্যন্তরে ইতিহাস বিষয়টিকে অন্তর্ভুক্ত করা দুষ্কর ছিল। অতি আগ্রহ ও যৎসামান্য লিখনকাজ সম্পাদনের নিমিত্তে যৎকিঞ্চিত যা পড়ি তাও ক’দিনের মধ্যে ভুলে যায়। পঠিত বিষয়গুলোকে পুনরায় খুঁটেখুঁটে দেখতে হয়। এবার বলুন-আলোচ্য বিষয়ে আমার দ্বারা উল্লেখযোগ্য কিছু সম্পাদন করা কি সম্ভব ? আদৌ নয়। নিজেকে যাচাই করে আমার যেটুকু আশাবাদ জন্মে তা দিয়ে নিজেই আশাবাদি হতে পারি না অধিকন্তু অন্যকে আশান্বিত করার মতো যোগ্যতা অর্জন করা এ জন্মে হবে না, প্রত্যাশা করাও অর্থহীন-বৃথাও বটে। যারা আমার লেখা পড়েন তারা বিষয়টিকে অনুধাবন করে থাকবেন নিশ্চয়। মূল কথা হচ্ছে আত্মবিশ্বাসের অভাববোধ থেকে মুক্ত হওয়া যায় না। এজন্য আমার কোনো কোনো লিখনিতে শুধুমাত্র বিষয়কে তুলে ধরার চেষ্টা করি। তুলে ধরার সক্ষমতাই হলো আমার যোগ্যতা। সেটির গভীরে গিয়ে আলোচনা করা সম্ভব হয় না। একটি উদারহণ দিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার করি। একবার ‘চাকমা হরফের সংখ্যা কত ?‘ শিরোনামে একটি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধ লিখেছিলাম। প্রবন্ধটি চট্টগ্রামের প্রচারবহুল একটি দৈনিকে দু’কিস্তিতে ছাপা হয়েছিল। পরে স্থানীয় সংকলনে ছাপানোর জন্যও দিয়েছিলাম। অনুজপ্রতীম একজন আমাকে প্রশ্ন করেছিল- ‘দাদা, এ বিষয়ে আপনার মত কী ? উত্তরে বলেছিলাম-আমার কাজটিই হলো তুলে ধরা। যারা বিবেচক বা নীতিনির্ধারক তারাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। মাঝে মাঝে লিখতে লিখতে আটকে যায়। শুরু করতে হয় ঘাটাঘাটি। তখন অনুভব করি, আসলে ইতিহাস নিয়ে পড়াশুনা করা বড্ড প্রয়োজন ছিল। ইতিহাস পাঠে যে আনন্দ সর্বোপরি ইতিহাস জানা অত্যাবশ্যক এটি এখন হারে হারে অনুভব করি। আমাদের ন্যায় অতিশয় সংখ্যালগিষ্টদের নিজেদের ইতিহাস জানা খুবই জরুরি। তাই বলে অ্যাকাডেমিক্যালি শুধুমাত্র ইতিহাস অধ্যয়ন করতে হবে সেটি বলছি না। অন্যান্য বিষয়ের সাথে ইতিহাস পাঠ বা অধ্যয়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি নিজেদের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, ধর্ম নানা দিক অবশ্যই জানা দরকার। মূল বিষয়ে দৃষ্টি ফেরা যাক।
অবস্থা দৃষ্টিতে মনে হয় যা অনেকে স্বীকারও করবেন যে, চাকমাদের হরফগুলোর ব্যবহার আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়ে গেছে। তার অর্থ এই-চাকমা হরফ জানা মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতিহাস বলে, চাকমাদের একশত বিশ বৎসর পূর্বেও নিজস্ব হরফ জানা লোকের সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে ছিল। কালে কালে তা তলানিতে এসে থামে। যাক বর্তমান সময়ে সবচেয়ে আশার কথা হচ্ছে-আধুনিক প্রযুক্তিতে চাকমা হরফ ব্যবহার করা যায়। নিজস্ব হরফে অনেকে গল্প, কবিতা, ছড়া এবং ছোট-খাটো পত্রিকাও প্রকাশ করছেন। উন্নয়ন সংস্থাগুলোর পরবর্তী ধারে ২০১৭ খ্রি. থেকে সরকারিভাবে চাকমা হরফে পাঠ্যবই প্রকাশ করা হচ্ছে। ফলাফল যা-ই আসুক না কেন আমরা নি:সন্দেহে বলতে পারি, চাকমা হরফগুলোর বিস্তৃতি ঘটছে। আমার বিশ্বাস, আলোচ্য কর্মকাণ্ডগুলোকে সুষ্ঠু সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হলে ভাল ফলাফল পাওয়া যাবে। কিন্তু হঠাশার বিষয় হচ্ছে-হরফগুলোর যত্রতত্র নিয়মবিহীন অযৌক্তিক ব্যবহার, নানাবিধ নিয়ম চালু করার প্রবণতা, হরফগুলোর আকৃতিগত বৈসাদৃশ্য, প্রচলিত নিয়মের পরিপন্থি মাজ্যাপাঠ-এর অপপ্রয়োগ, বানানে ভিন্নতা ইত্যাদি অপ্রত্যাশিত বিষয় চাকমা হরফগুলোর সহজ ব্যবহারকে জটিল করে তুলেছে। ফলশ্রুতিতে আশারবাণীর পাশাপাশি হঠাশারবাণীও আমাদের আঁকড়ে ধরে। বিকাশমান একটি বিষয়ে পজেটিভ বা নেগেটিভ থাকা অযৌক্তিক কিছু নয়। তবে চাকমাদের হরফগুলো নিয়ে যে ধরনের খাদ্য-অখাদ্য প্রায়শ নজরে আসে সেগুলিতে নেহায়েৎ নিজেকে তুলে ধরার বিষয়টি বেশি প্রাধান্য পায়। অর্থাৎ মত-অভিমতের আড়ালে থাকে ব্যক্তির পাণ্ডিত্যকে উপস্থাপন করার সুপ্ত মনোবাসনা। মত এবং অভিমতের ভীড়ে আমাদের চাকমা হরফগুলোর প্রকৃত বৈশিষ্ট্যগুলো চাপা পড়ছে। খেয়াল করবেন, চাকমা ইতিহাসের কথা বলবো না অন্ততপক্ষে হরফগুলো নিয়ে যাচ্ছেটাই ঘটছে।
পৃথিবীতে হরফ বা বর্ণের সংখ্যা খুবই কম। সকল জাতির মধ্যে নিজস্ব হরফ নেই। এজন্য যাদের নিজস্ব হরফ আছে যেগুলো স্মরণাতীত সময় থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে তারা নি:সন্দেহে ভাগ্যবান। আবার এটিও পরীক্ষিত যে, বিদ্যমান হরফগুলোর মাধ্যমে একটি ভাষার সব ধ্বনি বা শব্দকে উচ্চারণ করা যায় না। বাকযন্ত্রের সাহায্যে যে অজস্র ধ্বনি সৃষ্টি করা যায় সেগুলিকে প্রকাশ করার জন্য অক্ষরের সংখ্যা একবারে অপ্রতুল। যার কারণে অনেক গবেষণা করে আইপিএ(IPA) সৃষ্টি করতে হয়েছে। নিজস্ব হরফ থাকায় চাকমারা নি:সন্দেহে ভাগ্যবান। ইতিপূর্বের প্রবন্ধে আমি হরফগুলোর প্রাচীনত্ব, ব্যবহারিক নানা দিক তুলে ধরেছি। আমরা জানি, অন্যান্য হরফের ন্যায় চাকমা হরফগুলোরও নিজস্ব কিছু স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যেগুলো স্মরণাতীত সময় থেকে অনুসরণ করা হচ্ছে। অনেক স্বাতন্ত্রিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে যেগুলো অন্য কোনো হরফে দেখা যায় না। যেমন-উবরতুল্যা, মাজ্যা, ডেইলভাঙ্যা ইত্যাদি। বলা হয় চাকমা হরফে বারমাত্রা ব্যবহার জানলে পুরোপুরি শিখন সম্পন্ন হয়ে যায়। অর্থাৎ যিনি জানেন তিনি বিশেষজ্ঞ লেভেলে উন্নিত হতে পারেন। কিন্তু বারমাত্রার প্রয়োগ আদৌ যুক্তিসম্পন্ন কি না তা বিচায্য বিষয়। কারণ পূর্বে যারা চাকমা হরফে লিখনকাজ করতেন তাদের মধ্যে ধ্বনি সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা ছিল না। যে যার সুবিধামত হরফগুলো ব্যবহার করতেন। ব্যক্তি বিশেষে বানানের ভিন্নতা ছিল। এমন দেখা গেছে যে, কোনো একজন রচয়িতার লিখনি অন্য একজনের কাছে পাঠ করতে কষ্টকর হয়ে থাকে। এ অবস্থায় পূর্বের কোনো বানান বা চিহ্নকে অন্ধভাবে অনুসরণ করা কতটুকু যুক্তিসংগত হবে তা ভেবে দেখা উচিত। অধিকন্তু অতিরিক্ত চিহ্ন ব্যবহার থেকেও বিরত থাকা প্রয়োজন। শব্দের অর্থভেদে যদি বানানের ভিন্নতা খোঁজা হয় তাহলে অজস্র চিহ্ন ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেবে। যতসম্ভব সরল নিয়ম প্রচলন করা দরকার। পাশাপাশি চাকমা ধ্বনিগুলোকে সুনির্দিষ্ট নিয়মের আওতায় আনতে না পারলে সমস্যা থেকেই যাবে। বিজ্ঞ অনেকের মতামত প্রত্যাশায় এখানে শেষ করছি।
-০-
লেখক-শুভ্র জ্যোতি চাকমা, রিসার্চ অফিসার, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক ইনস্টিটিউট, রাঙ্গামাটি।

Share:

Saturday, June 20, 2020

কামাল লোহানীর মৃত্যুতে আদিবাসী সংগঠনগুলোর শোক

কামাল লোহানীর মৃত্যুতে আদিবাসী সংগঠনগুলোর শোক

বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব কামাল লোহানীর মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছে আদিবাসী সংগঠনগুলো। ভাষা সৈনিক ও মুক্তিযোদ্ধা কামাল লোহানী আমৃত্যু বাংলাদেশের আদিবাসীদের সংকটে সাথী ছিলেন এবং আদিবাসী অধিকার নিয়ে স্বোচ্ছার ভূমিকা রেখেছেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন এবং পাহাড়ের আদিবাসীদের সংকটে নানা সময় পাশে দাঁড়িয়ে সংহতি জানিয়েছিলেন।

এদিকে তাঁর মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের সাধারন সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং। আদিবাসী ফোরামের নেতারা ভার্চুয়াল মাধ্যমে শোক প্রকাশ করে বলছেন, ‘বাংলাদেশের আদিবাসীরা তাঁদের এক অকৃত্রিম বন্ধুকে হারাল।’

এদিকে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদের অফিসিয়াল ফেসবুক পেইজ থেকে শোক জানিয়ে বলা হয়, পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের আন্দোলন তথা পাহাড় ও সমতলের আদিবাসী মানুষের অকৃত্রিম বন্ধু হিসেবে কামাল লোহানী আদিবাসী মানুষের কাছে চির স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। জুম জনপদের নানা সংকট ও হাহাকারে আওয়াজ তোলা এ মানুষটির প্রয়ানে বিনম্র শ্রদ্ধাও জানিয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রাম পাহাড়ী ছাত্র পরিষদ।

বার্ধক্যজনিত নানা জটিল রোগসহ করোনায় আক্রান্ত হয়ে আজ সকালে মারা যান বহু গুনের অধিকারী এ মানুষটি। প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ের অগ্রপথিক এ মানুষটির প্রয়ানে আরো শোক জানিয়েছে হিল উইমেন্স ফেডারেশন, আদিবাসীদের মানবাধিকার সংগঠন কাপেং ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশ আদিবাসী নারী নেটওয়ার্ক, বাংলাদেশ আদিবাসী ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ।

Share:

Sunday, June 14, 2020

পার্বত্য চট্টগ্রামে জুম্মদেরকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণ

 হিল ভয়েসসাম্প্রতিক সময়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বৌদ্ধহিন্দু  খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী আদিবাসী জুম্মদেরকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণের কার্যক্রম জোরদার হয়েছে বিশেষ করে আর্থিক সুযোগসুবিধাশিক্ষাস্বাস্থ্যসেবাগৃহ নির্মাণগরুছাগল পালনসুদমুক্ত ঋণ ইত্যাদি প্রলোভন দেখিয়ে বান্দরবান জেলায় ধর্মান্তরকরণ চলছে বান্দরবান জেলায় ‘উপজাতীয় মুসলিম আর্দশ সংঘ’, ‘উপজাতীয় মুসলিম কল্যাণ সংস্থা’  ‘উপজাতীয় আর্দশ সংঘ বাংলাদেশ’ ইত্যাদি সংগঠনের নাম দিয়ে জনবসতিও গড়ে তোলা হয়েছে এবং এসব সংগঠনের মাধ্যমে জুম্মদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণের কাজ চালানো হচ্ছে

এমনকি লেখাপড়া শেখানোর লোভ দেখিয়ে ছোট ছোট ছেলেমেয়েদেরকে তাদের মাতাপিতা থেকে নিয়ে ঢাকাগাজীপুরসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় পিতামাতার অজান্তে মাদ্রাসায় ভর্তি করানো এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার সংবাদ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে উঠে এসেছে অন্যদিকে জুম্ম নারীদেরকে ফুসলিয়ে কিংবা ভালবাসার প্রলোভন দেখিয়ে বিয়ে করা এবং ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করার ঘটনা সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে কোন কোন ক্ষেত্রে বিয়ের কিছুদিন পর বিবাহিত জুম্ম নারীকে শারীরিক নির্যাতন করা এবং নানা অজুহাতে তাড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও ঘটেছে এমনকি বিবাহিত জুম্ম নারীর সাথে যৌন জীবনের ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতেও দেখা গেছে

বলাবাহুল্যস্মরণাতীত কাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম একটি অমুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চল চাকমামারমাত্রিপুরাতঞ্চঙ্গ্যা, ম্রো, বমখিয়াংলুসাইপাংখো, খুমী, চাক প্রভূতি আদিবাসী জাতি স্মরণাতীত কাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাস করে আসছেযারা বৌদ্ধহিন্দু ও খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী এবং সম্মিলিতভাবে নিজেদেরকে ‘জুম্ম’ (পাহাড়িনামে পরিচয় দেয়

১৯৪৭ সালে ভারতপাকিস্তান বিভক্তির সময় পার্বত্য চট্টগ্রামে বৌদ্ধহিন্দু  খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী এসব আদিবাসী জাতিসমূহের জনসংখ্যা ছিল ৯৭.% আর ছিল মুসলিম বাঙালি জনসংখ্যা . হিন্দু বাঙালি জনসংখ্যা .% ভারত বিভক্তি আইনকে সম্পূর্ণভাবে লঙ্ঘন করে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ব্রিটিশরা পার্বত্য চট্টগ্রামকে ইসলামিক রাষ্ট্র পাকিস্তানের সাথে যুক্ত করে দেয় এতে জুম্ম জনগণ প্রতিবাদ করে এবং ভারতে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানায় কিন্তু তৎকালীন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস তথা ভারতীয় নেতৃবৃন্দের উদাসীনতার কারণে জুম্ম জনগণের দাবি অগ্রাহ্য থেকে যায়

ছবি: ফেসবুক থেকে

অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্তির পর পরই তৎকালীন পাকিস্তান সরকার পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার কার্যক্রম হাতে নেয় তার মধ্যে অন্যতম হলো জুম্ম জনগণের রক্ষাকবচ হিসেবে বিদ্যমান ব্রিটিশ প্রবর্তিত আইনবিধি  বিধিব্যবস্থা বাতিল করাআইন লঙ্ঘন করে মুসলিম জনগোষ্ঠীকে পার্বত্য চট্টগ্রাম বসতি প্রদান করাউন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ  বাস্তবায়নের (ডেভেলাপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ারিংয়েরমাধ্যমে জুম্ম জনগণের অর্থনৈতিক মেরুদ– ভেঙ্গে দেয়া এবং তাদের চিরায়ত ভূমি  বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করাসর্বোপরি বৌদ্ধহিন্দু  খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী আদিবাসী লোকগুলোকে ধীরে ধীরে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশের সরকারসমূহও অমুসলিম অধ্যুষিত পার্বত্য চট্টগ্রামকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করার পাকিস্তানী পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ অব্যাহত রাখে যার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে ১৯৭৯ সাল থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত সরকারি অর্থায়নে সমতল অঞ্চলের চার লক্ষাধিক মুসলমান পার্বত্য চট্টগ্রামে বসতি প্রদান করা সেই সাথে চলতে থাকে নানা প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে কিংবা হুমকিধামকি দিয়ে জুম্মদেরকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণের কার্যক্রম ফলে যেখানে ১৯৪৭ সালে জুম্ম  মুসলিমদের অনুপাত ছিল ৯৮ জন জুম্ম ২ জন মুসলিমআজ ৭৩ বছর পর এই অনুপাত উল্টো হতে শুরু হয়েছে বর্তমানে ৫৫ জন মুসলিম ৪৫ জন জুম্ম আর আগামী ২০৪৭ সালের ঠিক উল্টো চিত্র অর্থাৎ ৯৮ জন মুসলিম ২ জন জুম্মএমনই অনুপাত দাঁড়াবে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামক অঞ্চলে জনসংখ্যার

১৯৯৭ সালে বাংলাদেশ সরকার  পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে স্বাক্ষরিত পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির পর ইসলাম ধর্মে দীক্ষিতকরণের কাজ কিছুটা ভাটা পড়েছিল কিন্তু দীর্ঘ ২৩ বছরেও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায়বিশেষ করে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরকারী শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের একনাগাড়ে দীর্ঘ ১২ বছর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকার পরও পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়িত না হওয়ায় প্রশাসনের ছত্রছায়ায় মৌলবাদী গোষ্ঠী কর্তৃক জুম্মদের ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরকরণের কাজ বর্তমানে চাঙ্গা হয়েছে নিম্নে এর কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হলো

শিক্ষার সুযোগ দানের ফাঁদ পেতে মাদ্রাসায় ভর্তি  ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণ

দেশের কিছু প্রত্যন্ত আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকার শিশুদের জোরপূর্বকভাবে তাদের স্ব স্ব ধর্ম থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে এসমস্ত পরিবারসমূহ আর্থিক অস্বচ্ছলতা  তাদের এলাকা থেকে স্কুলের দুর্গম্যতার কারণে তাদের শিশুদের স্কুলে পাঠাতে না পারায়দরিদ্র ও নিরক্ষর আদিবাসী পরিবারের শিশুরা এরূপ ধর্মান্তরকরণের প্রধান শিকার এই অমুসলিম আদিবাসী সম্প্রদায়কে ধর্মান্তরিত করার উদ্দেশ্যে ধর্মীয় মৌলবাদীরা সারা দেশকে ‘ইসলামীকরণ’-এর উদ্দেশ্য নিয়ে গোপনে কাজ করে যাচ্ছে এক্ষেত্রে তারা পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠীকে প্রলুব্ধ করার জন্য শিক্ষাকে ব্যবহার করছে

ছবি: স্ক্রীনসট ইউসুফ লীর ফেসবুক

দরিদ্র অনেক আদিবাসী মানুষের সাধ আছেকিন্তু সাধ্য নেই নিজেদের শিশুদের লেখাপড়া করানোর আর সেটাকেই ধর্মান্তরিতকরণের মোক্ষম সুযোগ  সম্ভাবনা হিসেবে বেছে নেয় ইসলামী মৌলবাদী চক্র দরিদ্র  নিরক্ষর আদিবাসী পরিবারের শিশুরা এরূপ ধর্মান্তরকরণের প্রধান শিকার

যেহেতু পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিকাংশ আদিবাসী জুম্ম জনগোষ্ঠী প্রত্যন্ত এলাকায় বসবাস করে থাকেসেহেতু জুম্ম শিশুদের ভালো স্কুলে পড়ার সুযোগ থাকে নাযদিও সেখানে আদৌ স্কুল থাকে স্কুলে যেতে  স্কুল থেকে ফিরে আসতে আদিবাসী শিশুদের পায়ে হেঁটে অতিক্রম করতে হয় কয়েক মাইল এছাড়া জুম্ম জনগোষ্ঠী জাতীয় সমাজের অন্যতম সবচেয়ে দরিদ্রতম অংশ হওয়ায়আর্থিক দুরবস্থার কারণে অনেক আদিবাসী পরিবারের তাদের শিশুদের ভালো স্কুলে পাঠানোর সামর্থ্য থাকে না ফলে তাদের শিশুদের জন্য ভালো শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারে এমন যে কোন সুযোগ যখন তারা খোঁজে

জানা গেছেইসলামী ধর্মীয় মৌলবাদীরা তারা ভালো স্কুলে শিক্ষার ব্যবস্থা করবে এই প্রলোভন দেখিয়ে এবং বিভিন্ন সুযোগসুবিধার কথাবলে আর্থিকভাবে অস্বচ্ছল আদিবাসী পরিবারগুলোকে আকৃষ্ট করে কিন্তু বাস্তবে এইসব ধর্মীয় মৌলবাদীরা আদিবাসী শিশুদের কখনোই ভালো স্কুলে নিয়ে যায় নাবরং ইসলামে ধর্মান্তরিত করার অভিসন্ধি নিয়ে তাদেরকে ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান মাদ্রাসায় নিয়ে যায় সেখানে সেই শিশুদের ধীরে ধীরে নিজের পরিবারসমাজ  সংস্কৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে ইসলামী ধর্ম  সংস্কৃতি শিখতে গ্রহণ করতে বাধ্য করে

গত  জানুয়ারি ২০১৭ঢাকায় এক মাদ্রাসায় পাচার হওয়ার সময়পুলিশ বান্দরবান শহরের ‘অতিথি আবাসিক হোটেল’ থেকে চার আদিবাসী শিশুকে উদ্ধার করে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তিরিত আবু বক্কর সিদ্দিক (৪৫)যার পূর্ব নাম মংশৈ প্রু চৌধুরী  মোহাম্মদ হাসান (২৫এই পাচারকাজের অন্যতম মূল হোতা বলে জানা যায় তাদেরকে উক্ত চারজন শিশুসহ হাতেনাতে গ্রেফতার করা হয় অপরদিকে তাদের সঙ্গী সুমন খেয়াং গ্রেফতার থেকে পালিয়ে যায় গ্রেফতারের পর বান্দরবান সদর থানায় একটি মানবপাচার মামলা দায়ের করা হয় উদ্ধারকৃত শিশুরা সকলেই বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়নের বাসিন্দা অপরাধ চক্রের সদস্যদের কর্তৃক শিশুদের পরিবারগুলোকে ঢাকায় বিনা খরচে তাদের শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করার প্রলোভন দেখানো হয়

উদ্ধারকৃত শিশুরাযারা সকলেই বান্দরবান জেলার রোয়াংছড়ি উপজেলার তারাছা ইউনিয়ন থেকেতারা হল– হেডম্যান পাড়ার উহ্লা অং মারমার মেয়ে মাসিং সই মারমা (১২ পাচিনু মারমার ছেলে থোয়াইলা মারমা ()বেতছড়ামুখ পাড়ার সাউপ্রু মারমার মেয়ে নুছিং উ মারমা (১২এবং বৈদ্য পাড়ার অং থোয়াই চিং মারমার মেয়ে মেচিং প্রু মারমা (১৩) পাচারকারী চক্রের সদস্যদের কর্তৃক শিশুদের পরিবারগুলোকে ঢাকায় বিনা খরচে তাদের শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা করার প্রলোভন দেখানো হয়

সুবিধাবঞ্চিত  অশিক্ষিত পরিবেশ থেকে আসা অনেক প্রত্যন্ত আদিবাসী পরিবার তাদের শিশুদের অধিকতর ভালো ভবিষ্যতের মিথ্যা আশার ফাঁদে পড়েন তবে এটা সবসময় বিনামূল্যে হয় নাপরিবারগুলোতে কয়েক হাজার টাকা থেকে শুরু করে কিছু টাকা খরচ করতে হয় যেহেতু ধর্মান্তরিতকরণ সম্পর্কিত কোন বিষয়ে ইঙ্গিত দেয়া হয় নাতাই মাবাবারা সহজেই তাদের শিশুদের জন্য ভালো ভবিষ্যতের প্রস্তাবে রাজি হয়ে যায়

কাপেং ফাউন্ডেশন ২০১৭ সালের তার বার্ষিক মানবাধিকার প্রতিবেদনের পূর্ববর্তী সংখ্যায় আদিবাসী শিশুদের জোরপূর্বক ধর্মান্তরিতকরণের এরকম কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরে তার পূর্ববর্তী  বছরে অন্তত ৭০ জন আদিবাসী শিশুঅধিকাংশই খ্রিস্ট্রীয়  হিন্দু ধর্মের সাথে যুক্ততাদেরকে দেশের বিভিন্ন অংশ থেকে পুলিশ কর্তৃক উদ্ধার করা হয় এসব শিশুদের অধিকাংশই বান্দরবান জেলা থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল

এর পূর্বে  জানুয়ারি ২০১৩পুলিশ ঢাকার সবুজবাগ থানাধীন আবুযোর জিফারি মসজিদ কমপ্লেক্স নামের এক মাদ্রাসা থেকে ১৬ আদিবাসী শিশুকে উদ্ধার করে শিশুদের জোর করে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয় ত্রিপুরা  চাকমা জাতিভুক্ত এসব শিশুদের পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতারণা করে নিয়ে যাওয়া হয় এছাড়া  ফেব্রুয়ারি ২০১৩ আদিবাসী ত্রিপুরা শিশুদের আরেকটি গ্রুপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাহাড়ি ছাত্র পরিষদের নেতৃবৃন্দ  ত্রিপুরা স্টুডেন্ট ফোরামের নেতৃবৃন্দ কর্তৃক ঢাকা থেকে উদ্ধার করা হয় শিশুদেরকে বান্দরবানের চিম্বুক এলাকা থেকে ফিরোজপুর জেলার একটি মাদ্রাসায় নেয়া হচ্ছিল তাদেরকে একটি মিশনারী স্কুলে ভর্তি করানো হবে বলে প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিল

এর আগে ২০১২ সালের জুলাই মাসেও গাজীপুর  ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসা থেকে ১১ জন আদিবাসী ত্রিপুরা শিশুকে উদ্ধার করা হয়। তাদের মধ্যে গাজীপুর জেলার মিয়া পাড়ার দারুল হুদা ইসলামী মাদ্রাসা থেকে  শিশুকে এবং ঢাকার মোহাম্মদপুরের এক মাদ্রাসা থেকে  নারী শিশু  গুলশানের দারুল হুদা মাদ্রাসা থেকে  শিশুকে উদ্ধার করা হয়

২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে পুলিশ কর্তৃক কেবল বান্দরবান শহরের এক মোটেল ‘অতিথি বোর্ডিং’ থেকে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী ৩৩ শিশুকে উদ্ধার করে বান্দরবানের থানচি উপজেলা থেকে এই শিশুদের সংগ্রহ করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ধানমন্ডী আদর্শ মদিনা স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হবে এই প্রতিশ্রুতি  প্রলোভন দেখিয়ে এসময় পুলিশ গর্ডন ত্রিপুরা ওরফে রুবেলঢাকার দারুল ইহসান মাদ্রাসার ছাত্র আবু হোরাইরা  শ্যামলীর বাসিন্দা আবদুল গণি নামের শিশুদের পাচারকারী তিন ব্যক্তিকে গ্রেফতার করে

অন্যদিকে লাদেন গ্রুপ নামে খ্যাত মুহাম্মদিয়া জামিয়া শরিফা লামা উপজেলায় দখল করেছে  হাজার একর পাহাড় ভূমি লাদেন গ্রুপের কার্যক্রমের মধ্যে অন্যতম হলো আদিবাসীদের বসতভিটা  জুমভূমি জবরদখল করাবিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে অর্থ দিয়ে আদিবাসী বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী  খ্রিস্টানদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা এবং ঢাকায় উন্নত  উচ্চ শিক্ষার প্রলোভন দিয়ে আদিবাসী শিশুকিশোরদের কৌশলে ঢাকায় নেয়া এই গ্রুপ ফাসিয়াখালীর মৌজার হেডম্যান মংথুই প্রু মারমার ২৫ একর জমিসহ ফাসিয়াখালী  সাঙ্গু মৌজার আদিবাসী ম্রোত্রিপুরা  মারমাদের শত শত একর জমি অবাধে দখল করে নিয়েছে লাদেন গ্রুপের বিরুদ্ধে জায়গাজমি জবরদখল করে অবৈধভাবে বাণিজ্যিক বাগান করা এবং এসব অঞ্চলে জঙ্গি তৎপরতা চালানোর অভিযোগ রয়েছে

অপরদিকে বান্দরবান জেলার লামা উপজেলায় ‘কোয়ান্টাম ফাউন্টেশন’ নামে জাতীয় পর্যায়ের একটি এনজিও কর্তৃক ২০০১ সাল প্রতিষ্ঠিত কোয়ান্টাম স্কুল  কলেজে নানা প্রলোভন দেখিয়ে জুম্ম ছাত্রছাত্রীদের ভর্তি করা হয় কোয়ান্টাম আবাসিক স্কুলে জুম্ম ছাত্রছাত্রীদের মাতৃভাষায় কথা বলতে বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়ে থাকে ফলে মাতৃভাষায় কথা বলার সুযোগের অভাবের কারণে জুম্ম শিশুরা মাতৃভাষা ভুলে যেতে থাকে বিশেষ করে কোয়ান্টামে ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুরক্ত  সেই ধর্মীয় সংস্কৃতিতে জুম্ম ছাত্রছাত্রীদের গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে উক্ত কলেজে জুম্ম ছাত্রছাত্রীদেরকে সরাসরি ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিতকরণে উদ্বুদ্ধ না হলেও ইসলামী আদবকায়দা  জীবনাচারে গড়ে তোলা হয় তাদেরকে শ্রেণিকক্ষে ‘সালামালিকুম’, ‘ওলাইকুম সালাম’ ইত্যাদি ইসলামী সম্বোধন ব্যবহার করতে বাধ্য করা হয় নামাজ কিভাবে আদায় করতে হয় তা শেখানো হয়

ছবি: স্ক্রীনসট মো: ইউসুফ লীর ফেসবুক

কোয়ান্টাম সংস্থা শুরু থেকে জুম্মদের মনজয় করার উদ্দেশ্যে প্রত্যেক কোরবান ঈদের সময় শত শত গরু জবাই করে আশপাশের এলাকার সকল জুম্মদেরকে ডেকে ডেকে তালিকা করে গরুর মাংস ভাগবন্টন করে দিতো এর পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল পন সেজে সহজ সরল জুম্মদেরবিশেষ করে ম্রোদের জায়গা জমি দখল করে নেয়া  তাদেরকে ইসলামী খাদ্যসংস্কৃতিতে অভ্যস্ত করা  মে ২০১৭ তারিখে ঢাকা থেকে এক নাগরিক প্রতিনিধিদল কোয়ান্টাম কর্তৃক লামায় ম্রো গ্রামবাসীর প্রায় ,০০০ একর ভূমি বেদখল করা এবং জুম্ম ছাত্রছাত্রীদের মাতৃভাষায় কথা বলার সুযোগের অভাবের কারণে তাদের মাতৃভাষা ভুলে যাওয়ার অভিযোগ তদন্ত করতে গেলে সেনাবাহিনী বাধা প্রদান করে ফলে তদন্ত না করে নাগরিক প্রতিনিধিদলকে ঢাকায় ফিরতে হয়

বাংলাদেশের সংবিধান দেশের শিশুদেরকে জোরপূর্বক ধর্মীয় শিক্ষা প্রদানে নিষেধ করে সংবিধানের ৪১(ধারায় উল্লেখ রয়েছে যে, ‘কোন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যোগদানকারী কোন ব্যক্তির নিজস্ব ধর্মসংক্রান্ত না হইলে তাঁহাকে কোন ধর্মীয় শিক্ষ গ্রহণ কিংবা কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠান বা উপাসনায় অংশগ্রহণ বা যোগদান করিতে হইবে না’ তবু আদিবাসী শিশু  তাদের পরিবার শিক্ষার ফাঁদে পড়ায়আদিবাসী শিশুদের জোরপূর্বক ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণ অব্যাহতভাবে চলছে রাষ্ট্র একদিকে আদিবাসী শিশুদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হচ্ছেঅপরদিকে ইহা সংবিধানকে লংঘন করছে

তবু  পর্যন্ত সরকারি সংস্থা  বেসরকারি সংগঠনসমূহের তরফ থেকে আদিবাসী শিশুদের তাদের নিজেদের ধর্ম থেকে অপর একটি ধর্মে দীক্ষিতকরণ থেকে রক্ষার উদ্দেশ্যে কোন উদ্যোগ দেখতে পাওয়া যায় না সরকারি  বেসরকারি উভয় সংস্থা থেকে কতজন শিশু ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়ে সে ব্যাপারে যথাযথ কোন তথ্যউপাত্ত পাওয়া যায় না যদি অবিলম্বে  ধরনের ধর্মান্তরকরণ প্রতিরোধে কোন পদক্ষেপ নেয়া না হয়তাহলে অনেক আদিবাসী শিশু তাদের বিশ্বাসসংস্কৃতিভাষা জীবিকা হারিয়ে ফেলবে

উপজাতীয় মুসলিম আর্দশ সংঘ  তাবলীগ জামায়াত কর্তৃক আলিকদম  লামায় ধর্মান্তরকরণ

বান্দরবান জেলার আলিকদম উপজেলা থানচি সড়ক ১১ কিমি এলাকায়  জানুয়ারি ২০১৮ সালে ১৪টি অসহায়  গরিব পরিবারকে আর্থিক সহযোগিতা দেওয়ার নাম করে তাদের মাঝে সুদ মুক্ত ঋণতাদের মাঝে গৃহপালিত গরুছাগল দেওয়া হবেতাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার সুযোগ করে দেওয়া সহ নানা ধরনের প্রলোভন দেখিয়ে দরিদ্র পাহাড়িদের মন ভুলিয়ে সুযোগ বুঝে গোপনে উপজাতীয় মুসলিম আর্দশ সংঘ  দাওয়াতে তাবলীগের মাধ্যমে তাদেরকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করছে

গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়ঈদগাঁও মডেল হাসপাতাল এন্ড ডায়াবেটিস কেয়ার সেন্টারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ডামোইউসুফ আলী মানবকল্যাণ কাজ তথা অসহায়গরীবদু:স্থ রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসা সেবাসহ নানান মানব সেবামূলক কাজকর্মের মাধ্যমে স্থানীয় গরিব পাহাড়িদের সম্পর্ক গড়ে তোলে তেমনি তার হাসপাতালে চিকিৎসা করতে আসা উপজাতীয় মুসলিমদের সাথে পরিচয় ঘটে তাদের সমস্যার কথা জেনে  পরিবারগুলোর সন্তানদের লেখাপড়ার সুব্যবস্থা করে বর্তমানে বিভিন্ন মাদ্রাসায় ১৯ জনের মত জুম্ম ছেলেমেয়ে মুসলিম রয়েছে অনেকে ঈদগাঁও বিভিন্ন মাদ্রাসা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া শেষ করছে

কয়েকজন উপজাতীয় মুসলিমদের সাথে কথা বলে জানা যায় যেইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলে তাদেরকে বিভিন্নভাবে আর্থিক সহযোগিতা ও সুযোগ সুবিধা দেওয়া হবেগরুছাগলনগদ অর্থগৃহ নির্মাণ করে দেওয়াসহ সুদ ঋণ দেওয়া হবে ইত্যাদি প্রলোভন দেখানো হয় খ্রীস্টান ধর্ম থেকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হওয়া আবু বক্কর ছিদ্দিক (যার পূর্বের নাম অতিরম ত্রিপুরাবলেনকোর্ট গিয়ে এফিডেভিট মূলে ধর্ম ও নাম পরির্বতন করে মুসলিম হতে হয় তিনি আরো বলেনবর্তমানে তার ছেলে সাইফুল ইসলাম (পূর্বের নাম রাফেল ত্রিপুরাডাইউসূফ আলী হাসপাতালে চাকরিরত আছে

তিনি বলেনবাইবেলে লেখা আছে যে তোমরা সত্যকে খোঁজসত্য তোমাদের মুক্ত করবে সে সত্যকে খুঁজতে গিয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন বলে তিনি জানান তার মাবাবাভাইসহ সবাই মুসলিম হয়েছে অন্যদিকে আলিকদমের জেসমিন আক্তার (পূর্বের নাম ঝর্ণা ত্রিপুরা)রোয়াংছড়ির সাদেকুল ইসলাম (জয়খর্ন ত্রিপুরা)গয়ালমারার নুরুল ইসলাম (প্রশান্ত ত্রিপুরাসবাই এফিডেভিট মুলে ধর্ম ইসলাম গ্রহণ করেছেন বলে জানান তবে তারা আরো উল্লেখ্য করেন যেইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার পর ডাইউছুপ আলীর সাথে যোগাযোগ করলে তিনি তাদেরকে মানবিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেন

এদিকে লামা উপজেলার গয়ালমারা গ্রামে বসাবসরত ত্রিপুরাদের উপজাতীয় মুসলিম কল্যাণ সংস্থা  উপজাতীয় আর্দশ সংঘ বাংলাদেশতাবলিগ  জামায়াতএর আলেম হাফেজ মোজহিরুল ইসলামহাফেজ মোকামালমোমোহাম্মদুল্লাহহাফেজ মোসালামাতুল্লাহমৌলভী হেলাল উদ্দিন ত্রিপুরা এবং সাইফুল ইসলাম ত্রিপুরা সভাপতি উপজাতীয় নুও মুসলিম আর্দশ সংঘ তাদের নেতৃত্বে গয়ালমারা ৪৫টি পরিবারকে আর্থিক  নানা ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দিয়ে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে

অন্যদিকে আলিকদমের জেসমিন আক্তার পূর্বের নাম ঝর্ণা ত্রিপুরারোয়াংছড়ির সাদেকুল ইসলাম পূর্বের নাম জয়খর্ন ত্রিপুরাগয়ালমারায় নুরুল ইসলাম পূর্বের নাম প্রশান্ত ত্রিপুরা সবাই ইসলামী ধর্মান্তরকরণের শিকার হয়েছেন আলিকদমথানচি ১১ কিলো এলাকাসহ মোট ৪৫ পরিবার ইসলামে ধর্মান্তরিত হয়েছেন

সরেজমিন তদন্তে জানা যায় যেবান্দরবান পৌর এলাকার বাস ষ্টেশনে ১৯৯৯ সালের দিকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত ত্রিপুরা  খিয়াং রয়েছে ৩০এর অধিক পরিবার এবং টাংকি পাড়ায় ২০০১ সাল থেকে বসবাস রয়েছে নুও ত্রিপুরা মুসলিমদের ১৫এর অধিক পরিবার

লামা উপজেলার লাইনঝিড়িতে ১৯৯৫ সাল থেকে ত্রিপুরা মুসলিমদের ১৭এর অধিক পরিবার ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে গত উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মোঃ রাসেল ত্রিপুরা (পূর্বের নাম রামন্দ্র ত্রিপুরা)-এর স্ত্রী সারেবান তাহুরা ত্রিপুরা মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিল আলিকদমথানচি সড়কের ক্রাউডং (ডিম পাহাড়এলাকায় (রূপসী ইউনিয়ন২০০০ সাল থেকে ত্রিপুরা মুসলিমদের রয়েছে ১৬ পরিবারের মতো

দীঘিনালা রিজিয়ন কমান্ডার কর্তৃক ধর্মান্তরকরণ

১৯৯২ সালে দীঘিনালা রিজিয়ন কমান্ডার কর্ণেল মাহবুব হাসান আর্থিক প্রলোভন দেখিয়ে জোর করে আটজন চাকমাকে ইসলাম ধর্মে ধর্মান্তরিত করেন ধর্মান্তরিতরা ব্যক্তিরা হলেন– বলিরঞ্জন চাকমানামকরণ মোঃ সাজেদ আলী শেখ.স্বর্ণা চাকমানামকরণফাতেমা খাতুনরসিক গুরি চাকমানামকরণ মোসাম্মত রওশন আরা বেগমমিলাবো চাকমানামকরণ মোসাম্মত তসলিলা খাতুনদিঘী কুমার চাকমানামকরণ মোঃ আবদুল্লাহসুখী চাকমানামকরণ মোসাঃ সখিনা খাতুন এবং শংকর চাকমানামকরণ আবদুল শহীদ মোঃ সাইফুল ইসলাম তাদের ইসলামে ধর্মে দীক্ষা দেন মৌলবী হাফেজ মোহাম্মদ আবুল বাশার তাদের শপথনামা পাঠ করান দীঘিনালা থানার নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাসুদ রানা যাদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয় তারা সকলে দীঘিনালার বানছড়া গ্রামের বাসিন্দা (সূত্রঃ স্নেহ কুমার চাকমাজীবনালেখ্যপৃষ্ঠা২০৮)


ছবি: সেনাবাহিনীকে আলিকদমের ১১ কিলোমিটারে ধর্মান্তরিত নুও উপজাতীয় মুসলিমদের জন্য নির্মিত মসজিদ পরিদর্শন করতে দেয়া যাচ্ছে।

  পার্বত্য চট্টগ্রামে মৌলবাদী ও জুম্ম বিদ্বেষী কিছু ইসলামী গোষ্ঠী কর্তৃক সুপরিকল্পিতভাবে আদিবাসীদের ইসলামে ধর্মান্তরিত করার ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত হচ্ছে। এধরনের পরিকল্পনা বা কার্যক্রম অনেক আগে থেকে শুরু হলেও সাম্প্রতিককালে এর তৎপরতা অনেক জোরদার হয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ধর্মান্তরিতকরণের এই প্রক্রিয়া স্থানীয়ভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন জেলায় যেমন চলছেতেমনি ভালো শিক্ষার প্রলোভন দেখিয়ে আদিবাসী জুম্ম শিশুদের পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে নিয়ে গিয়ে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা হচ্ছে।

২০১৭ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা ত্রিবিউনইউএনপিওবুড্ডিস্টডোর.নেটহেরাল্ডমালয়েশিয়া.কমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ও প্রতিবেদনে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ীজানুয়ারি ২০১০ হতে জানুয়ারি ২০১৭ সালের মধ্যে সাত বছরে কেবল পুলিশ কর্তৃক ধর্মান্তরে জড়িত ইসলামী চক্রের হাত থেকে ৭২ জন আদিবাসী জুম্ম শিশুকে উদ্ধার করা হয়েছে। এর বাইরে যে আরও অনেক আদিবাসী পরিবার ও শিশু এধরনের অপরাধী চক্রের শিকার হয়েছেন তা সহজেই অনুমেয়। সাম্প্রতিককালে এই ধর্মান্তরিতকরণের তৎপরতা আরও ব্যাপকতা লাভ করেছে বলে জানা গেছে।

সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমেইউটিউবে প্রচারিত বিভিন্ন ভিডিওপোস্ট এবং দেশি-বিদেশী বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনতথ্য-উপাত্ত থেকে তা আরও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। বিগত কয়েক বছরের মধ্যেবিশেষত কোভিড-১৯ প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পরপরই বান্দরবান পার্বত্য জেলার আলিকদম উপজেলাসহ বিভিন্ন এলাকায় আদিবাসীদের এ ধরনের ধর্মান্তরিতকরণের ব্যাপক কার্যক্রমের খবর পাওয়া গেছে। যেখানে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সম্মতি ও সহযোগিতা রয়েছে বলে স্বীকার করা হয়েছে।

আপাত দৃষ্টিতে এই ধর্মান্তরিতকরণ প্রক্রিয়াকে বিচ্ছিন্ন বা সাধারণ মনে হলেও নিবিড়ভাবে লক্ষ্য করলে এটি একটি পরিকল্পিত ও সুসমন্বিত কার্যক্রমের অংশ বলে প্রতীয়মান। এই কার্যক্রমে মৌলবাদী ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর যে প্রত্যক্ষ হাত রয়েছে তা বলাই বাহুল্য। আর বাংলাদেশ সেনাবাহিনী যে এই প্রক্রিয়াকে নিবিড়ভাবে আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে তাও সুস্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অপরদিকে ক্ষমতাসীন সরকারি দলের জুম্ম সম্প্রদায়ের স্থানীয় নেতৃত্ব ও কর্তৃপক্ষের চোখের সামনেই এসব নির্বিঘ্নে ঘটে চলেছে। অবশ্য আদিবাসীদের ধর্মান্তরকরণ ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনে সহযোগিতা ও মদদদানের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের সম্পৃক্ততা এর পূর্বেও বিভিন্ন সময়ে দেখা গেছে।

৪ জুন ২০২০ নিপন ত্রিপুরা তার এক ফেসুবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘সম্প্রীতির বান্দরবানে আর্থিক অস্বচ্ছলতাকে কাজে লাগিয়ে প্রান্তিক অঞ্চলে বসবাসরত ত্রিপুরাদের অবাধে ধর্মান্তরিত করার ইতিহাস অনেক বছরের পুরনো। সাম্প্রতিক সময়ে তা বহুগুণ বেড়ে গেছে।

একই দিন লংদুকসা মউগ্রো এম তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে এ প্রসঙ্গে লেখেন, ‘সহজ-সরল সাধারণ জুম্ম আদিবাসীদের ভুলিয়ে ভালিয়ে ইসলামিকরণ করা হচ্ছে। কিভাবে মোনাজাত করা হয় শেখানো হচ্ছে। পার্বত্য চট্টগ্রামে ইসলামিকরণ প্রক্রিয়ার অংশ এটি। এখানে খোদ সরকার সংশ্লিষ্ট রয়েছে বলে জানা গেছে। করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের মধ্যে ইসলামিকরণ ও বাঙালিকরণ প্রকল্পের ধুম পড়েছে বান্দরবানের আলীকদমে।

ছবি: নুও উপজাতীয় মুসলিম শিশুদের দেখা যাচ্ছে (ইউসুফ আলীর ফেবসুক থেকে)

প্রান্তিকতাদারিদ্র্য  নিরক্ষরতাই ধর্মান্তরিতকরণের সুযোগ

পার্বত্য চট্টগ্রাম দেশের দীর্ঘদিনের অন্যতম সুবিধাবঞ্চিতঅর্থনৈতিকভাবে পশ্চাদপদ ও অবহেলিত এবং রাজনৈতিকভাবে অশান্ত ও অবদমিত এক এলাকা। ইসলামী রাষ্ট্র পাকিস্তান আমলে যেমনি এই অঞ্চল চরম অবহেলাশোষণবঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেতেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরও এই অঞ্চলের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও আন্দোলনকে দমন-পীড়নের কারণে জনগণের সামগ্রিক জীবনধারাকে বরাবরই একটা ভঙ্গুর পরিস্থিতি অতিক্রম করতে হয়েছে।

১৯৯৭ সালের ২রা ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার সমাধানসংঘাত নিরসন ও জুম্মসহ স্থায়ী অধিবাসীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ সরকার ও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলেও বিগত ২৩ বছরেও সেই চুক্তি পূর্ণাঙ্গভাবেএমনকি চুক্তির মৌলিক বিষয়সমূহ যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে পার্বত্য সমস্যার সমাধানএলাকায় শান্তি ও জনগণের সুষম উন্নয়ন এবং জুম্মদের রাজনৈতিকঅর্থনৈতিকসামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনধারার উন্নয়ন এখনও সেই তিমিরেই রয়ে গেছে।

বিশেষত চুক্তি স্বাক্ষরকারী দল আওয়ামীলীগ নেতৃত্বাধীন সরকার টানা একযুগের অধিক ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেওসর্বোপরি চুক্তি লংঘন ও চুক্তির সাথে বিরোধাত্মক ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়ায় পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনজীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তাঅস্থিতিশীলতাহতাশা ও ক্ষোভ। এই অবস্থায় সরকার ও প্রশাসনের ছত্রছায়ায় বিভিন্ন স্বার্থান্বেষী মহল কর্তৃক বৃদ্ধি পেয়েছে জুম্মদের ভূমি বেদখলস্বভূমি থেকে উচ্ছেদতাদের উপর নিপীড়নবঞ্চনা ইত্যাদি। ফলে পার্বত্য চট্টগ্রামের আরও অনেক আদিবাসী জুম্মর জীবনধারা অধিকতর প্রান্তিক অবস্থার দিকে যেতে বাধ্য হয়েছে।

একদিকে আদিবাসীদের এই প্রান্তিক অবস্থাসামাজিক বিচ্ছিন্নতাআর্থিক দূরবস্থাতাদের নিরক্ষরতা ও অজ্ঞতাঅপরদিকে সরকারপ্রশাসন ও স্থানীয় স্বার্থবাদীদের আনুকূল্য ও পৃষ্টপোষকতাÑএই দুই বাস্তবতার সুযোগকে কাজে লাগিয়েই ইসলামী মৌলবাদী চক্র তাদের ধর্মান্তরিতকরণের নীলনকশা বাস্তবায়নে ও জোরদারকরণে উৎসাহিত হয়েছে।

বান্দরবান কি ধর্মান্তরকারীদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে?

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন পার্বত্য জেলাই ইসলামী মৌলবাদী ধর্মান্তরকারী গোষ্ঠীর টার্গেট ও কর্মক্ষেত্র হলেওসাম্প্রতিককালে বান্দরবান পার্বত্য জেলায় ইসলামী গোষ্ঠী কর্তৃক দরিদ্র আদিবাসী জুম্মদের ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণ তৎপরতা উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। মনে হয়বান্দরবান যেন এখন ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। একটি সূত্রের মতেবান্দরবান পৌরসভাআলিকদমরোয়াংছড়িলামাসহ বিভিন্ন এলাকায় ১০টির অধিক জুম্ম মুসলিম পাড়া বা বসতি রয়েছে। এইসব ধর্মান্তরিত জুম্ম মুসলিমদের বলা হচ্ছে নও মুসলিম’ বা উপজাতি মুসলিম। এই ধর্মান্তরিত মুসলিম বসতিগুলোকে ঘাটি হিসেবে ব্যবহার করে এবং কিছু বাছাইকৃত নও মুসলিমকে সুবিধা দিয়ে তাদের মাধ্যমে প্রতিনিয়ত ধর্মান্তরের কার্যক্রম সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে।

বান্দরবানের আলিকদম উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা একে এম আইয়ুব খানডাঃ ইউসুফ আলীহাফেজ মাওলানা সালামাতুল্লাহআলিকদম সদরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ফরিদ আহম্মদআলিকদম উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আবুলকালামমোঃ জাহিদসাহাব উদ্দিনমাওলানা ইমরান হাবিবিমোহাম্মদ আইয়ুব প্রমুখ এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ ও বিভিন্ন প্রমাণ পাওয়া গেছে।

অপরদিকে আদিবাসী থেকে ধর্মান্তরিত যেসব নও মুসলিম এসব ধর্মান্তরকরণের সাথে জড়িত তাদের মধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছেতারা হল- জনৈক চাকমা ধর্মান্তরিত মুসলিম মোঃ শহিদউপজাতীয় মুসলিম আদর্শ সংঘের সহ-সভাপতি মৌলভী হেলাল উদ্দিনত্রিপুরাউপজাতীয় মুসলিম আদর্শ সংঘের সম্পাদক ধর্মান্তরিত মুসলিম ইব্রাহিম ত্রিপুরামুসলিম পাড়া মডেল একাডেমির শিক্ষক ধর্মান্তরিত মুসলিম সাইফুল ইসলাম ত্রিপুরাআবু বক্কর ছিদ্দিক (পূর্ব নাম অতিরম ত্রিপুরা)খাগড়াছড়ির মোঃ আব্দুর রহিম (পূর্ব নাম ভিনসেন্ট চাকমা)মোঃ আব্দুর রহমান (পূর্ব নাম ভন্দ চাকমা)মোঃ ইব্রাহিম (পূর্ব নাম ভবাৎ চাকমা) প্রমুখ।

ছবি: আলিকদমে ১১ কিলোতে ধর্মান্তরিত উপজাতীয় নুও মুসলিমদেরকে মোনাজাতের প্রশিক্ষণ দিতে দেখা যাচ্ছে।

সম্প্রতি বান্দরবানের আলিকদমের এক টিলায় কলাবাগানের মধ্যে শিশু ও নারীসহ কয়েকজন সাধারণ জুম্মকে মোনাজাতের প্রশিক্ষণের ভিডিও প্রচারিত হয়। ভিডিওটিতে আলিকদম উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা একে এম আইয়ুব খান কর্তৃক মোনাজাত অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করতে দেখা যায়। এতে এসময় ৩ জন শিশুবিভিন্ন বয়সের ৪ জন নারী১০/১১ জন বিভিন্ন বয়সের আদিবাসী পুরুষকে মোনাজাতের প্রশিক্ষণ দিতে দেখা যায়। মোনাজাতে বেশ কয়েকজন মুসলিম বাঙালিও অংশগ্রহণ করেন।

আলিকদম উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা একে এম আইয়ুব খান কর্তৃক ধারনকৃত ও প্রচারিত আরেক ভিডিওতে জানা গেছেইতোমধ্যে আলিকদম উপজেলার থানচি সড়ক সংলগ্ন ১১ কিলোমিটার নামক এলাকায় ধর্মান্তরিত মুসলিমদের নিয়ে ইসলামপুর’ নামে একটি পল্লী গড়ে তোলা হয়েছে। স্থাপন করা হয়েছে মুসলিম পাড়া মডেল একাডেমি। এই ধর্মান্তরিত মুসলিমরা যাতে নিজেদের ঐতিহ্যসংস্কৃতি ভুলে গিয়ে গোঁড়া মুসলিম হিসেবে গড়ে উঠতে পারে সেই উদ্দেশ্যে সেখানে গড়ে তোলা হয়েছে মসজিদ ও মাদ্রাসা। উপজাতীয় মুসলিম আদর্শ সংঘবাংলাদেশ’ নামে সংগঠন গড়ে তোলা হয়েছে। এমনকি এই ধর্মান্তরিত আদিবাসী মুসলিম পরিবারের তরুণীদের সরাসরি মুসলিম ছেলেদের সাথে বিয়ে দেয়ার জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে। ১১ কিলো এলাকায় অন্তত ৪৫ পরিবার আদিবাসী ধর্মান্তরিত মুসলিম রয়েছে বলে জানা গেছে।

স্থানীয় সূত্র অনুযায়ীমাত্র মাস দুয়েক আগে বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলার আলেক্ষ্যং ইউনিয়নের ছাঃলাওয়া পাড়ায় (শীলবান্ধা পাড়া) ৫ মারমা পরিবারকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। সেই ধর্মান্তরিত পরিবারগুলি হল ১. অংঙৈসিং মারমা (পরিবারের সদস্য ৫ জন)২. খ্যাইসাথুই মারমা (পরিবার সদস্য ৪জন)৩. রেগ্যচিং মারমা (পরিবারের সদস্য ৬ জন)৪. সিংনুমং মারমা (পরিবারের সদস্য ৫ জন)সাবেক মেম্বরতার এক মেয়ে ১০-১৫ বছর আগে এক মুসলিম ছেলেকে বিয়ে করে৫. লোইসাংমং মারমা (পরিবারের সদস্য ৭ জন)।

জানা গেছেএরা কেউই জেনে-বুঝে বা আগ্রহী হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেনি। তাদের আর্থিক দূর্বলতার সুযোগে সুকৌশলে তাদেরকে মুসলমান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। রেগ্যচিং মারমা ও অংঙৈচিং মারমার দুই সন্তানকে ভালো ভবিষ্যতের প্রলোভন দেখিয়ে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়ে বিনিময়ে তাদেরকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা হয়েছে। জানা গেছেসোলার প্যানেল দেওয়ার নাম করে তাদের কাছ থেকে আইডি কার্ড সংগ্রহ করা হয় এবং এরপর তাদেরকে মুসলমান হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

প্রধান হোতা ডাঃ ইউসুফ আলী  মাওলানা একে এম আইয়ুব খান?

স্থানীয় সূত্র ও বিভিন্ন তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতেআলিকদমসহ বান্দরবানে আদিবাসী জুম্মদের ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণের সাথে সাম্প্রতিককালে সবচেয়ে সক্রিয় ও তৎপর হিসেবে দেখা গেছে ডা: ইউসুফ আলী নামে এক বহিরাগত চিকিৎসক ও আলিকদম উপজেলা জামে মসজিদের ইমাম মাওলানা একে এম আইয়ুব খানকে। তারা আদিবাসীদের অভাব-অনটনের সুযোগ নিয়ে বিভিন্ন প্রলোভন দেখিয়ে প্রতিনিয়ত আদিবাসীদের ধর্মান্তরিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন এবং গরীব-অশিক্ষিত আদিবাসীদের ধর্মান্তরের জন্য এফিড্যাভিটসহ আইনি ও আর্থিক সহযোগিতা প্রদান করছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছেডাঃ ইউসুফ আলীর গ্রামের বাড়ি বগুড়ায়তবে বর্তমানে কক্সবাজারে থাকেন। সেখানে ঈদগাহ মডেল হসপিটাল ও ডায়াবেটিস কেয়ার সেন্টারের প্রতিষ্ঠাতাব্যবস্থাপনা পরিচালক ও আবাসিক সার্জন হিসেবে দায়িত্বে আছেন। জানা গেছেতিনি অত্যন্ত সুক্ষভাবে ও সুকৌশলে বান্দরবানের আলিকদমসহ বিভিন্ন এলাকায় যেখানে সুযোগ পাচ্ছেন সেখানে আদিবাসী জুম্মদের ধর্মান্তরিতকরণে সক্রিয়ভাবে সাহায্য-সহযোগিতাবুদ্ধি-পরামর্শ ও পৃষ্টপোষকতা দিয়ে যাচ্ছেন। অপরদিকেতিনি যেহেতু নিজে একজন চিকিৎসক এবং আর্থিকভাবে সমর্থসেকারণে অনেক সময় বিনা পয়সায় চিকিৎসার নামে অথবা কিছু আর্থিক সহযোগিতার নামেও আদিবাসীদের ধর্মান্তরিতকরণ করছেন।

ছবি: ইউসুফ আলী ফেসবুকের স্ক্রীনসট

ডা: মং এ নু চাক এর সাথে ক্যামেরাই ছবি তুলে তিনি গত ৩ জুন তার এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেনWe hate racism but believe in brotherhood (অর্থাৎআমরা বর্ণবাদ ঘৃণা করিতবে ভ্রাতৃত্বে বিশ্বাস করি)। কিন্তু তিনি যে গরীব আদিবাসীদের সরলতাদারিদ্র ও শিক্ষার অভাবের সুযোগ নিয়ে তাদেরকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করার মধ্য দিয়ে মুসলিম বাঙালি বর্ণবাদ চাপিয়ে দিচ্ছেন এবং তাদের স্বকীয় সংস্কৃতির ধ্বংস করে চলেছেন সেই বোধ কি তিনি হারিয়ে ফেলেছেনমধুর কথার ফুলঝুরিতেমানব সেবার আড়ালে তিনি কি এই আধুনিক যুগেও মধ্যযুগীয় কায়দায় অত্যন্ত অমানবিক ও ঘৃণ্য কাজ করছেন না?

গত ২৮ মে ২০২০ তিনি তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লেখেন, ‘আমাদের এক প্রিয় নওমুসলিমা পারভীন ত্রিপুরা। মানিকগঞ্জের এক মহিলা মাদ্রাসায় পড়ত। মা ও বর্তমান বাবা নও মুসলিম। সে মাদ্রাসায় পড়ালেখার কারণে তার তাকওয়া ছিল প্রশংসনীয়। বাবা-মা মুসলিম হলেও ইসলামি সংস্কৃতির চেয়ে ত্রিপুরা সংস্কৃতিকে প্রাধান্য বেশি দেয়। …তাকে একবার ছুটিতে এনে আর মাদ্রাসায় যেতে দেয় না। সে যেন বাইরে যেতে না পারে এজন্য তার বোরখাটা পুড়ে ফেলে বাবা। তাকে বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালায়। সে শর্ত দেয় পাত্রকে হাফেজ ও আলেম হতে হবে। কিন্তু তারা এক ছেলের সাথে তার অমতে বিয়ে ঠিক করে। সে বুঝতে পারে তার ইসলামের উপর চলা বন্ধ হয়ে যাবে। তখন সেতার বান্ধবীর সাথে কথা বলে রাখে। ফজরের আগে উঠে বান্ধবীর বোরখা নিয়ে পালায়। … রাতে খবর পাই সে মাদ্রাসায় গিয়ে পৌঁছেছে। আমরা আশ্বস্ত হই। সে আর বাড়িতে আসে না।

ডাঃ ইউসুফ আলী পরে এই পারভীন ত্রিপুরার সাথেই কক্সবাজারের ঈদগাহ কেন্দ্রীয় মসজিদের ইমাম হাফেজ মাওলানা সালামাতুল্লাহর বিয়ের ব্যবস্থা করেন।

পারভিন ত্রিপুরার বিষয়ে ফেসবুকের কথোপকথনে জনৈক Hillary Try Mhvc মন্তব্য কলামে লেখেন, ‘দোয়া ত করি ৩/৫ বছর পর মেয়াদ শেষ হলে বাপের বাড়ি দরজায় সামনে আসবেন না পারভিন বেগম ত্রিপুরা আপা। এর জবাবেডাঃ ইউসুফ আলী লেখেন, ‘কেনঅবশ্যই যাবেশুদ্ধিকরণ মিশন নিয়ে যাবে। অলরেডি তার ছোটভাই কুরআন হিফজ শুরু করেছে।’ এখানে ডাঃ ইউসুফ আলী শুদ্ধিকরণ মিশন নিয়ে যাবে’ বলে কী বোঝাতে চেয়েছেনএটা কি এই সমস্ত পারভিন বেগম ত্রিপুরা বা চাকমা-মারমা ধর্মান্তরিত মুসলিমদের দিয়ে বেধর্মী বা অশুদ্ধ আদিবাসীদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করার মধ্য দিয়েই তিনি তথাকথিত শুদ্ধিকরণ মিশন এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথারই সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেননি?

এই ডা: ইউসুফ আলীর নেতৃত্বেই আলিকদমের ধর্মান্তরিত আদিবাসী মুসলিমদের ইসলামপুর’ নামক মুসলিম পাড়ায় মসজিদ ও মাদ্রাসা নির্মাণ করা হয়। সেখানে তিনি তার নেতৃত্বে কক্সবাজারের বায়তুশ শরফ থেকে ডাক্তারদেরকে নিয়ে এসে মাঝে মধ্যে বিনামূল্যে চিকিৎসা ব্যবস্থারও আয়োজন করেন।

ডা: ইউসুফ আলী তার ১৩ মে ২০২০ তারিখে ছবিসহ এক ফেসবুক পোস্টে লেখেন, ‘ডানের বাচ্চা সাইমুনা ত্রিপুরাপিতা-ওমর ফারুক ত্রিপুরাবামের বাচ্চা আয়েশা ম্রোপিতা-ইব্রাহিম ম্রোমাঝখানে আমি বাঙালি। অনেক পার্থক্যদুটি বড় মিল। প্রথম মিল আমরা মানুষ আর দ্বিতীয় মিল আমরা মুসলিম।’ বাচ্চা দুটিকে তিনি দুপাশে দুটি রেখে ছবি উঠেন। বাচ্চাগুলো এখনও অবুঝদেড়-দুই বছরের বেশি হবে না।

ডা: ইউসুফ আলীর অন্যতম সহচর হচ্ছেন মাওলানা একে এম আইয়ুব খানযিনি আলিকদম উপজেলা পরিষদ জামে মসজিদেরইমাম। জানা যায়তিনি আলিকদমের ১১ মাইল এর ধর্মান্তরিত মুসলিমদের যাবতীয় বিষয় দেখাশোনা ও তত্ত্বাবধানসহ বান্দরবানেরআদিবাসীদের ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণের ক্ষেত্রে অন্যতম সমন্বয়কারীর ভূমিকা পালন করে থাকেন। এই ধর্মান্তরকরণের প্রচার ও প্রসার কাজেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

সম্প্রতি বান্দরবানের আলিকদমের এক টিলায় কলাবাগানের মধ্যে শিশু ও নারীসহ কয়েকজন সাধারণ জুম্মকে মোনাজাতের প্রশিক্ষণ ও দীক্ষা অনুষ্ঠানের ভিডিও প্রচারিত হয়। এতে ৩ জন শিশুবিভিন্ন বয়সের ৪ জন নারী১০/১১ জন বিভিন্ন বয়সের আদিবাসী পুরুষকে দেখা যায়। এসময় বেশ কয়েকজন মুসলীম বাঙালিও অংশগ্রহণ করেন। এই মোনাজাত প্রশিক্ষণ ও দীক্ষা অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন মাওলানা একে এম আইয়ুব খান।

ছবি: নুও উপজাতীয় মুসলিম নির্মাণাধীন মসজিদের সামনে মাওলানা একে এম আইয়ুব খানের ভিডিও বার্তা দিচ্ছেন।

জানুয়ারি ২০১৯ এর দিকে ধারণকৃত এবং পরে ইউটিউবে প্রচারিত এক ভিডিওতে মাওলানা একে এম আইয়ুব খান বলেন, “..সম্মানীত দ্বীনী ভাইয়েরাআপনারা যারা এই ভিডিওটি দেখতে পাচ্ছেনআপনারা খুব খেয়াল করেন। কিছুদিন আগেও আমরা একটা ভিডিও দিয়েছিলাম। আমার আইয়ুব খান এই পেইজে। নও মুসলীমদের বান্দরবান উপজেলার আলিকদমের থানচি সড়কে আরকিথানচি সড়কে এগারো কিলোতে কিছু আমাদের ভাইয়েরা ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তাদের কিছু বাচ্চাপ্রায় ১৭-১৮ জন ছেলেদেরকে পড়ানো হচ্ছে মাদ্রাসায়। তাদের জন্য আমাদের এক দ্বিনী ভাই তার আব্বারই ইচ্ছার সোয়াবের জন্য এই যে আমাদের নও মুসলীম ভাইদের জন্য একটা মসজিদ আমরা নির্মাণ করেছি। এই যে আপনারা দেখতে পাচ্ছেনএই মসজিদটি..

তিনি আর বলেন, “…যদি কেউ কিছু করতে চানআপনারা সরাসরি এসে করতে পারেন। এখানে কোন ধরনের অসুবিধা হবে না।আমরা এখানে সেনাবাহিনীদের কাছ থেকে অনুমতি নিয়েছি এবং উনারা আমাদেরকে সহযোগিতা করেন।” তবে ইহা তদন্তের বিষয় যেতারা তাদের এ কাজে আরও কার কার সহযোগিতা ও পৃষ্টপোষকতা গ্রহণ করছেন।

লক্ষ্য যখন জুম্ম নারী

জুম্মদের ধর্মান্তরিত করার এবং আধিপত্য বিস্তার ও জাতিগত নির্মূলীকরণের অন্যতম পন্থা হিসেবে লক্ষ্যভুক্ত করা হয় আদিবাসী নারীকে। ধর্ষণধর্ষণের পর হত্যাঅপহরণযৌন হয়রানি ইত্যাদি সহিংসতা ছাড়াও জুম্ম সমাজকে আঘাত করার অন্যতম উপায় হিসেবে বেছে নেয়া হয় তথাকথিত ভালোবাসা বা ছলনার ফাঁদে ফেলে জুম্ম নারীদের করায়ত্ত করা। আর জুম্ম নারীকে বিয়ে করা বা ভাগিয়ে নিয়ে যাওয়া মানেই হচ্ছে তাকে সহজে ইসলামে ধর্মান্তরিত করা।

ছবি: লাভ জিহাদের শিকার এক ত্রিপুরা নারীর ইসলামে ধর্মান্তরের হলফনামা।

এই সহিংসতা বা বিয়ে করে ধর্মান্তরিত করা- সবকিছুতেই সরকার বা প্রশাসন তথা রাষ্ট্রের উদাসীনতাআশ্রয়-প্রশ্রয়মদদ ও পৃষ্টপোষকতা থাকে। যে কারণে চুক্তির পূর্বে ও পরে শত শত জুম্ম নারী ধর্ষণধর্ষণের পর হত্যাসহ নানা সহিংসতার শিকার হলেও কোন ঘটনারই যথাযথ ও দৃষ্টান্তমূলক বিচার পাওয়া যায়নি। সাম্প্রতিক কালে ধর্ষণের অভিযুক্তদের কাউকে কাউকে গ্রেফতার করা হলেও শেষ পর্যন্ত তারা দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি পায় না।

সম্প্রতি সহিংসতার পাশাপাশিবাঙালি মুসলিমদের কর্তৃক ভালোবাসা বা ছলনার ফাঁদে ফেলে জুম্ম নারীদের বিয়ে করে ধর্মান্তরিত করা বা সমাজ থেকে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রবণতাযাকে বলা হচ্ছে লাভ জিহাদ’, সেটা অনেক বৃদ্ধি পাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে অনেক জুম্ম নারী চরম প্রতারণার শিকার হচ্ছে এবং বিপদগ্রস্ত হচ্ছে।

অতি সম্প্রতি এমন প্রতারক ও বিকৃত রুচিসম্পন্ন এক মুসলিম যুবকের প্রতারণা তথাকথিত লাভ জিহাদের শিকার হয় আদিবাসী ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের এক শিক্ষিত নারী। ঐ মুসলিম যুবক প্রেমের অভিনয় করে উক্ত ত্রিপুরা নারীর সাথে শারীরিক সম্পর্কও গড়ে তোলে এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সেসবের ভিডিও ফুটেজ ধারণ করে। একপর্যায়ে মুসলিম যুবকটি ঢাকার ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে মেয়েটিকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করে পরিবার ও সমাজের অমতে বিয়েও করে। পরে ঐ যুবক ত্রিপুরা মেয়েটিকে বিভিন্ন অসামাজিক কর্মকান্ডে জড়িত করার চেষ্টা করে। এসময় মেয়েটি ছেলেটির ভয়ংকর উদ্দেশ্য বুঝতে পেরে তার কাছ থেকে সরে আসার প্রচেষ্টা চালায়। আর এসময় মুসলিম যুবকটি তাদের শারীরিক সম্পর্কের ভিডিও ফুটেজ সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করে। ফলে মেয়েটি পারিবারিক ও সামাজিকভাবেগভীর সংকটের মধ্যে পড়ে।

গত ৩০ মে ২০২০ Pb Chakma Lxr Wangza তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে Ismail Abir এর একটি পোস্ট শেয়ার করেন। সেখানে Ismail Abir লেখেন, ‘হে মুসলিম যুবকেরা আমাদের লাভ জিহাদ” চলবে। আমাদের তাকিয়া (মিথ্যাচার) হিন্দুখ্রিস্টানবৌদ্ধ ধর্মের মেয়েরা বুঝবে না। তাদের কাছে ভালোবাসা নামক অস্ত্র এমনভাবে প্রয়োগ করো যেন এরা বুঝতে না পারে। তাই আমাদের আগে যে মিশন ছিল সেগুলোকে আপডেট করতে হবে।

ছবি: ইসমাইল আবীরের ফেসবুক স্টাটাস

যেমন: ১। তাদের ব্লাকমেইল করুন২। (এটা অনেকের জন্য অপাঠ্য এবং অশ্রাব্য তাই দেয়া গেল না)৩। ছলেবলে একবার হলেও বিছানায় নিনআবারযদি বিয়ে করতে পারেন তবে নিম্নের কাজ করুন- (১) বিয়ে করে ধর্মান্তর করুন ও হিন্দুদের মাঝে তাকে দিয়ে ইসলাম প্রচার করুন। (২) তাদের পেট থেকে কমপক্ষে ৫টা বা তার থেকে বেশি বাচ্চা জন্ম দিন। আর যদি পারেন একটা বাচ্চা পেটে দিয়ে ছেড়ে দিন। ওই মেয়ে আরেক মুসলিম খুজে নেবেকোন হিন্দু তাকে গ্রহণ করবে না। (৩) যে কয়টা পারবেন সেই কয়টা বিধর্মীদের বিয়ে করবেন আর পেটে বাচ্চা দিয়ে ছেড়ে দিন।

উল্লেখ্য যেএ পর্যন্ত বহু আদিবাসী জুম্ম নারী এধরনের প্রতারণা বা লাভ জিহাদের শিকার হয়ে তাদের ব্যক্তিগতপারিবারিক ও সামাজিক জীবনে বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন। বস্তুত আদিবাসীদের প্রতি সহিংস দৃষ্টিভঙ্গি ও আদিবাসী নারীদের প্রতি পাশবিক লালসা থেকেই এই ধরনের চিন্তা ও ঘটনার জন্ম।

ধর্মান্তরিতকরণ কি জাতিগত নির্মূলীকরণেরই অংশ!

বাংলাদেশের সংবিধানে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। অপরদিকে সংবিধানে, ‘হিন্দুবৌদ্ধখ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্ম পালনে রাষ্ট্র সমান মর্যাদা ও সমান অধিকার নিশ্চিত করবে’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১১ সালের শুমারী অনুযায়ী বাংলাদেশে মাত্র ৮.৫% ভাগ হিন্দু এবং মাত্র ১% ভাগ বৌদ্ধখ্রিস্টান ও অন্যান্য ধর্মের লোক রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ইসলাম যেন এই স্বল্প সংখ্যক ভিন্নধর্মী আদিবাসীদের অস্তিত্বও ধ্বংস করতে তৎপর হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রামকে আদিবাসী জুম্ম অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত করে ইসলামীকরণ করা এবং পার্বত্যাঞ্চল থেকে জুম্মদের জাতিগতভাবে নির্মূলীকরণের অন্যতম অংশ হিসেবে এই ধর্মান্তরিতকরণ চলছে বলে অনেক আদিবাসী জুম্মর অভিযোগ। এমনকি আরাকানকক্সবাজার ও তিন পার্বত্য জেলাকে নিয়ে একটি ইসলামী জঙ্গী গোষ্ঠীর নতুন একটি ইসলামিক রাষ্ট্র কায়েমের যে অভিপ্রায় ও ষড়যন্ত্র এটি তারই এক অংশ কিনা তাও উড়িয়ে দেয়া যায় না।

বস্তুত দেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই এই ইসলামীকরণের ষড়যন্ত্র শুরু হয়। তবে এই কার্যক্রম আরও জোরদার হয় আশির দশকের শুরুতে ১৯৭৯-৮০ সালের দিকে হীন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দেশের সমতল অঞ্চল থেকে ৪-৫ লক্ষ বহিরাগত সেটেলার বাঙালি পার্বত্য চট্টগ্রামে অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে জুম্মদের জায়গা-জমিতে বসতিদানের মধ্য দিয়ে। ১৯৮০ সালের দিকে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙ্গামাটি জেলার লংগদুতে সৌদি আরব ও কুয়েতের অর্থায়নে স্থাপন করা হয় ইসলামিক মিশনারী সংগঠন আল রাবিতা। এর রয়েছে হাসপাতাল ও কলেজ।

কার্যত এর প্রদান উদ্দেশ্য ইসলামী ভাবধারাকে সম্প্রসারিত করাসেটেলার বাঙালিদের সহায়তা এবং আদিবাসী জুম্মদের ইসলামে ধর্মান্তরিতকরণের প্রচেষ্টা চালানো। এই প্রতিষ্ঠানের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক দেখা যায় মূলত জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্র শিবিরের সাথে। লংগদু ছাড়াওরাঙ্গামাটির বরকল উপজেলায় এবং বান্দরবানের আলিকদম উপজেলায়ও এর হাসপাতাল রয়েছে বলে জানা যায়। ১৯৯০ সালে আল রাবিতা মিশনারী কেন্দ্র আলীকদমে ১৭ জন মারমাকে ইসলামে ধর্মান্তরিত করে।

বস্তুত এই ধর্মান্তরিতকরণের ফলাফল বা পরিণতি যে আদিবাসী জুম্মদের সংখ্যালঘুকরণতাদের উপর সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা তাদের সংস্কৃতি ধ্বংসকরণতাদের রাজনৈতিকসামাজিকসাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় জীবনধারায় ক্ষতিসাধনজুম্ম অধ্যুষিত পার্বত্য অঞ্চলকে মুসলিম অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণতকরণসর্বোপরি জুম্মদের পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে জাতিগতভাবে বিলুপ্তকরণেরই নামান্তরতা বলাইবাহুল্য।

Share:

Find Us On Facebook

Blog Archive